প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশ এখনই কোনো তাড়াহুড়ো করতে চায় না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক আলোচনা এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বুধবার (২০ আগস্ট) প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন কবির বলেন, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে নানা খবর প্রকাশিত হলেও সেগুলোকে এখনো নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করছে না ঢাকা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকার এই মুহূর্তে কোনো তাড়াহুড়ো না করার নীতি গ্রহণ করেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হলে এবং সফরের জন্য সম্মানজনক পরিবেশ সৃষ্টি হলে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনকে অনুমাননির্ভর বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তাঁর ভাষ্য, দুই দেশের সম্পর্ক এবং সরকারপ্রধান পর্যায়ের সফর অনেকাংশে ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি ও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তারা কীভাবে মূল্যায়ন করছে, তার ওপর নির্ভর করছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের জনগণের বড় অংশের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে দ্রুত কোনো শীর্ষ পর্যায়ের সফর আয়োজনের যৌক্তিকতা নেই।
এ সময় বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক ব্যক্তিদের ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে নয়াদিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্য বজায় রেখেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, সৌদি আরবের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদার করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সয়াবিন আমদানি ও বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য ও অংশীদারত্ব চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বলেও মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন কৌশলগত সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেন হুমায়ুন কবির। তাঁর দাবি, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক মনোভাব ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফলে এ বিষয়ে জটিলতা কাটতে শুরু করেছে। শিগগিরই বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথ খুলে যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর কথা জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মিয়ানমার ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সব মিলিয়ে সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন হুমায়ুন কবির। তাঁর মতে, এই নীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।










