হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন সচল রাখতে গোপনে একটি বিশেষ নৌপথ চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ওমানের উপকূলঘেঁষা দক্ষিণের এই রুট দিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিরাতে ১৫ থেকে ২০টি তেলবাহী জাহাজ চলাচল করছে। এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছাচ্ছে।
মার্কিন দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে পরিমাণ তেল পরিবহন হতো, বর্তমান প্রবাহ তার প্রায় অর্ধেক। তবে মার্কিন সামরিক অভিযানের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হয়েছে বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।
কীভাবে কাজ করছে এই নৌপথ?
মার্কিন সামরিক বাহিনী শুধু তেলবোঝাই জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার করে দিচ্ছে না। খালি ট্যাংকারগুলোকে আরব সাগর থেকে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশেও সহায়তা করা হচ্ছে।
এসব জাহাজ উপসাগরীয় দেশগুলোর বন্দর থেকে তেল সংগ্রহ করে পরে আবার একই রুট ব্যবহার করে আরব সাগরের দিকে বেরিয়ে আসে।
প্রতিদিন মার্কিন নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্স জাহাজগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে। কোন জাহাজ কখন প্রণালি দিয়ে ঢুকবে এবং কোনগুলো কখন বের হবে, সেটিও নির্ধারণ করা হয়। এরপর সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা অনুযায়ী জাহাজগুলো দক্ষিণের নির্দিষ্ট নৌপথ ব্যবহার করে।
যুদ্ধবিমান দিয়ে দেওয়া হচ্ছে নিরাপত্তা
জাহাজগুলোর নিরাপত্তায় মার্কিন বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। এসব যুদ্ধবিমানের দায়িত্ব ইরানের ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে তেলবাহী জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, সম্প্রতি সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রায় দুই সপ্তাহের সামরিক অভিযানে ইরানের রাডার ও সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর এই রুট চালু করা সম্ভব হয়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের হাতে বর্তমানে কয়েকটি রাডার সক্রিয় থাকলেও হরমুজের দক্ষিণাঞ্চলে জাহাজগুলোর সুনির্দিষ্ট গতিপথ সম্পর্কে দেশটির নজরদারি সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
ইরানের হামলার আশঙ্কা
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান এখনো ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে জাহাজগুলোতে হামলার চেষ্টা করছে। তবে এসব হামলার বেশির ভাগই মার্কিন বাহিনী প্রতিহত করছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, চলতি সপ্তাহের শুরুতে আটটি ইরানি ড্রোন ও দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে মার্কিন বাহিনী।
গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিরাতে ১৫ থেকে ২০টি তেলবাহী জাহাজ দক্ষিণের এই রুট দিয়ে হরমুজে প্রবেশ বা প্রস্থান করেছে বলেও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
কখনো দেড় থেকে দুই কোটি ব্যারেলও গেছে
মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দৈনিক তেল রপ্তানি প্রায় ১ কোটি ব্যারেলে পৌঁছেছে। তবে কয়েকটি রাতে পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়া তেলের পরিমাণ ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত ছিল।
চলতি সপ্তাহের একটি রাতে ২০টির বেশি জাহাজকে দক্ষিণের রুট ব্যবহার করার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই রাতে প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের দাবি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার অ্যাক্সিওসকে বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল বের হচ্ছে। তবে ইরানের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে না বলেও জানান তিনি।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে ট্রাম্পের মন্তব্য, দেশটির এখনো কিছুটা লড়াই করার ক্ষমতা রয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে তাদের সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালির এই গোপন নৌপথ বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখার মার্কিন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে রুটটি ঘিরে ইরানের হামলার ঝুঁকি এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।










