চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর আলোচিত ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) আরমান উদ্দিন ও তাঁর ভাই আরিফ উদ্দিনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে আদালতে মামলা করেছেন এক প্রবাসী। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
রোববার চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে লোহাগাড়ার পশ্চিম কলাউজান এলাকার বাসিন্দা আমির হোসেন মামলাটি করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আদনান কবির জিলান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার আরজিতে আরমান উদ্দিন ও তাঁর ভাই আরিফ উদ্দিন ছাড়াও লোহাগাড়ার শওকত আলী, আদিল, আনোয়ার ও জয়নাল আবেদীনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে আরমান উদ্দিনের নেতৃত্বে তাঁর ভাইসহ কয়েকজন তাঁর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা না দিলে তাঁর বাড়ি ও মার্কেট দখল করে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদীর মালিকানাধীন লোহাগাড়ার আজিজ কমপ্লেক্সে চারতলা একটি ভবন রয়েছে। মামলার আরজিতে বলা হয়েছে, ২০০৬-০৭ সালের দিকে নিজের কেনা জমিতে তিনি ভবনটি নির্মাণ করেন। ভবনের নিচতলায় একটি আলমারির দোকান এবং অন্য অংশে বসতঘর ভাড়া দেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ এপ্রিল দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে আরমান উদ্দিন মোবাইল ফোনে বাদীর কাছে আবারও ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ঘর দখল করে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
এরপর ওই রাতেই আসামিরা আজিজ কমপ্লেক্সের নিচতলায় ভাড়াটিয়া ওবায়দুলের আলমারির দোকানের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সেখান থেকে বিভিন্ন ধরনের স্টিলের আলমারি, ওয়াল শোকেস, আলমারি শিটসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব মালামালের আনুমানিক মূল্য ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৯ টাকা বলে মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দোকানে থাকা একটি ক্যাশ টেবিল, যার ভেতরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ছিল, সেটিও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন বাদী। পরে দোকানে নতুন তালা লাগিয়ে দেওয়া হয় বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সময় আমির হোসেন দেশের বাইরে ছিলেন। দেশে ফেরার পর তিনি বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে আলোচনা করেন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২০ আগস্ট সকালে বৈঠকের কথা বলে অভিযুক্তরা তাঁর ভবনে আসেন। সেখানে আরিফ উদ্দিন আবারও ২০ লাখ টাকা দাবি করেন এবং টাকা না দিলে দোকান ও ঘরের দখল ছেড়ে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেন।
বাদীর আরও অভিযোগ, আরমান উদ্দিন মোবাইল ফোনে তাঁকে নিজের এলাকায় বসবাস করতে হলে তাঁদের কথামতো চলতে হবে বলে হুমকি দেন। একই সময় আদিল তাঁকে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে আরিফ উদ্দিন, শওকত আলী, আরমান উদ্দিন ও আদিল তাঁকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন বলে অভিযোগ করেছেন বাদী।
সর্বশেষ ঘটনার পর আমির হোসেন লোহাগাড়া থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলেও যায় বলে দাবি করেছেন তিনি। তবে পুলিশ মামলা গ্রহণ না করায় শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাদী।
বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করায় মামলার অভিযোগের বিষয়ে আরমান উদ্দিনের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। মামলার তদন্তের বিষয়ে সাতকানিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী জানিয়েছেন, মামলার নথিপত্র হাতে পাওয়ার পর তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
এদিকে আরমান উদ্দিনকে ঘিরে এর আগেও বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ের কাজে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী খোরশেদ আলমকে অপহরণ করে আটকে রেখে মারধর এবং চাঁদা দাবির অভিযোগও উঠেছিল। পাশাপাশি বালুমহাল, উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আদালত বা তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। নতুন মামলার তদন্তে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ঘটনা ও দায়ীদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।










