বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা জোরালো হলেও চলতি বছরে তা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর জাতীয় কাউন্সিল করার কথা থাকলেও সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর ইতোমধ্যে প্রায় ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। এখন কাউন্সিল আয়োজনের আগে দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস ও বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠনের কাজকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির সূত্র ও নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় কাউন্সিলের আগে দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হতে পারে। বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠন, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব দেওয়া, শূন্য পদ পূরণ এবং বিভিন্ন কারণে বহিষ্কৃত নেতাদের দলে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব কাজ শেষ করেই কাউন্সিল আয়োজন করতে চায় দলটির হাইকমান্ড।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের বিষয়ে দলের সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণের আগে বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এর মধ্যে কমিটি গঠন ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির বিষয় রয়েছে।
বিএনপির সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা। সে হিসাবে ২০১৯ সালে সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক চাপ, মামলা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কাসহ বিভিন্ন কারণে বড় পরিসরে কাউন্সিল আয়োজন করা কঠিন ছিল।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৪ এপ্রিল। ওই বৈঠকের পর তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছিলেন, দ্রুত দলকে জাতীয় কাউন্সিলের দিকে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সে সময় ধারণা করা হয়েছিল, বছরের শেষ দিকে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে।
তবে পরবর্তী সময়ে দলের সাংগঠনিক বাস্তবতায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় তিনি দলীয় মহাসচিবের দায়িত্বে নেই। তার পরিবর্তে রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন নেতৃত্ব কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম গুছিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জানিয়েছেন, কাউন্সিলের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান চলতি বছরের শেষ দিকে কাউন্সিল আয়োজনের কথা বলেছিলেন। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি বিবেচনায় নিয়ে কাউন্সিলের সময় আগে-পরে হতে পারে।
দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার মতে, এ বছর আর খুব বেশি সময় বাকি নেই। এর মধ্যে বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজ শেষ করে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করা কঠিন হতে পারে। ফলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চের আগে কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে তারা মনে করছেন।
কাউন্সিলের প্রস্তুতি হিসেবে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল ও শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে নতুন নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়েও সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস চলছে। জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নতুন কয়েকজন নেতাকে যুক্ত করা হলেও ১৯ সদস্যের এই ফোরামে এখনো তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি মৃত্যু, পদত্যাগ ও বহিষ্কারের কারণে ভাইস চেয়ারম্যানের কয়েকটি পদও শূন্য রয়েছে। এসব পদে প্রবীণ ও মধ্যম সারির নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে দলের মধ্যে আলোচনা চলছে।
কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পাশাপাশি জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা পর্যায়েও সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। কোথাও নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হচ্ছে, আবার কোথাও পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়ার কাজ চলছে। পাশাপাশি বহিষ্কৃত নেতাদের আবেদন যাচাই করে তাদের দলে ফিরিয়ে আনা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কার্যক্রমে আরও গতি এসেছে। কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বে পরিবর্তন এলে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠনের কাজ আরও জোরালো হতে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনও কাউন্সিলের সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তার আগে বিভিন্ন কমিটি গঠন করলে দলীয় অভ্যন্তরে ক্ষোভ বা অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার নির্বাচনের সঙ্গে কাউন্সিলের সময়সূচি সাংঘর্ষিক হলে সাংগঠনিক কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই সবকিছু বিবেচনা করেই কাউন্সিলের সময় নির্ধারণ করতে চায় বিএনপি।
এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, জাতীয় কাউন্সিলের দিনক্ষণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবে। তবে তিনি জানিয়েছেন, কাউন্সিল খুব শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে।
সব মিলিয়ে বিএনপির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে দলের অভ্যন্তরে প্রস্তুতি শুরু হলেও চলতি বছরের মধ্যে তা আয়োজনের সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। সাংগঠনিক পুনর্গঠন, শূন্য পদ পূরণ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব, বহিষ্কৃতদের ফিরিয়ে আনা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন—এসব বিষয় সমন্বয় করেই শেষ পর্যন্ত কাউন্সিলের সময় নির্ধারণ করা হবে। দলের বর্তমান তৎপরতা দেখে আগামী বছরের শুরুর দিকেই জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।










