ঘুম থেকে ওঠার পরপরই ফোন হাতে নেওয়া এবং দিনের শুরুতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদ কিংবা নানা ধরনের তথ্যের প্রবাহে ডুবে যাওয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রতিদিনের জীবনে কাজের চাপের পাশাপাশি অতিরিক্ত তথ্য গ্রহণ এবং অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করার প্রবণতা মানুষের মানসিক স্বস্তিকে নষ্ট করছে বলে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে বিশ্বের নানা প্রান্তের খবর। ঘুম থেকে ওঠার পরপরই ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখলেই যুদ্ধ, দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক সমস্যা কিংবা অন্যের ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা সামনে আসে। এসব তথ্যের অনেকগুলোর সঙ্গে ব্যক্তির সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও অবচেতনভাবে সেগুলোর মানসিক প্রভাব নিজের ওপর নিয়ে ফেলেন অনেকে।
বিবর্তন ও মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মন মূলত তুলনামূলকভাবে ছোট একটি সামাজিক পরিমণ্ডলের সমস্যা মোকাবিলার উপযোগী করে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন একজন মানুষ একই সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারছেন। ফলে মস্তিষ্ককে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে হচ্ছে। এতে মানসিক চাপ ও ক্লান্তি বাড়তে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। সেখানে সাধারণত মানুষের জীবনের নির্বাচিত কিছু ভালো মুহূর্তই বেশি দেখা যায়। কারও ভ্রমণ, সাফল্য, নতুন অর্জন, আনন্দ কিংবা বিলাসী জীবনযাপনের ছবি দেখে অনেকেই নিজের বাস্তব জীবনের সঙ্গে তুলনা শুরু করেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা এসব মুহূর্ত যে একজন মানুষের পুরো জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়, তা অনেক সময় ভুলে যান ব্যবহারকারীরা।
ফলে অন্যের আপাত সফলতার সঙ্গে নিজের বাস্তবতার তুলনা করতে গিয়ে তৈরি হতে পারে অযাচিত অতৃপ্তি। নিজের অর্জনকে ছোট মনে হওয়া, আরও বেশি কিছু করার চাপ অনুভব করা কিংবা নিজের জীবন নিয়ে হতাশ হওয়ার মতো মানসিক পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
এই ধরনের মানসিক ক্লান্তি কমাতে দৈনন্দিন জীবনে কিছু শৃঙ্খলা আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একসঙ্গে দীর্ঘ সময়ের সব দুশ্চিন্তা মাথায় না নিয়ে সময়কে ছোট ছোট পরিসরে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। প্রতিদিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং একসঙ্গে সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা না করাই ভালো।
এ ছাড়া কোন বিষয় নিজের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে আর কোনটি কেবল তথ্য হিসেবে জানা যাচ্ছে, সেই পার্থক্য করাও গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত মানসিক দায় নেওয়া থেকে বিরত থাকা মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা তৈরি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেওয়ার পরিবর্তে দিনের শুরুটা কিছুটা সময় ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে রেখে শুরু করা যেতে পারে। একইভাবে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদ দেখার অভ্যাস করা এবং সারাক্ষণ নোটিফিকেশন বা আপডেটের পেছনে না ছুটলে মস্তিষ্ক কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ পায়।
কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার পর ব্যক্তিগত সময়কে আলাদা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। সব সময় কাজ, সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরিবর্তে নিজের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা মানসিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের মূল বিষয় হলো, সব তথ্য জানা এবং সব বিষয় নিয়ে চিন্তা করা এক বিষয় নয়। প্রয়োজনীয় তথ্য গ্রহণের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় তথ্য ও সামাজিক তুলনা থেকে নিজেকে দূরে রাখাও মানসিক সুস্থতার অংশ। তাই ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে ফোন হাতে নেওয়ার অভ্যাস বদলে দিনের শুরুতে নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা এবং ডিজিটাল ব্যবহারে সীমারেখা তৈরি করাই হতে পারে মানসিক ক্লান্তি কমানোর একটি কার্যকর পদক্ষেপ।










