সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রীতি গ্রুপের এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে গ্যাস সিলিন্ডারবাহী লরিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পর চারটি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিভাগীয়ভাবে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাতজন নিহত এবং অন্তত ১৬ জন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে কাজে যোগ দিতে এসে কারখানা বন্ধ দেখতে পান শ্রমিকরা। পরে অনেকেই বাড়ি ফিরে যান। কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুর্ঘটনার কারণে ওই দিনের জন্য চারটি কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। কারখানাগুলো হলো প্রীতি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড, প্রীতি কম্পোজিট গার্মেন্টস লিমিটেড, অক্সফোর্ড কালারস লিমিটেড এবং এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেড।
স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু জানান, চারটি কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কাজ করেন। দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণে সোমবার কারখানাগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। কোনো শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন কি না, তা কারখানা খুললে আরও স্পষ্ট হবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে রোববার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ভেতরে এফএনএফ ইউটিলিটি বিল্ডিং সংলগ্ন এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারবাহী একটি লরিতে বিস্ফোরণ ঘটে। পরে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের শব্দ ও আগুনের শিখা আশপাশের এলাকাতেও আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, দেয়ালের পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা লরিগুলোর একটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে ৪ নম্বর লরিতে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই লরিতে থাকা সিলিন্ডারের অতিরিক্ত চাপ বা কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
জিরাবো ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শাহাবুদ্দিন জানান, কারখানায় তিতাসের গ্যাস সংযোগ থাকলেও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডারবাহী লরি থেকে গ্যাস ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে কয়েকটি সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
বিস্ফোরণের পর সিলিন্ডারের বিভিন্ন অংশ চারদিকে ছিটকে পড়ে। এর একটি অংশ পাশের একটি ১০ তলা ভবনের ছাদে গিয়ে পড়ে বলে জানা গেছে। আশপাশের কয়েকটি বাড়িঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
খবর পেয়ে জিরাবো ও ডিইপিজেড ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত সাড়ে ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে রাত ১১টা ৪৪ মিনিটে উদ্ধার অভিযান শেষ করা হয়।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, লরির ভেতর থেকে পাঁচজনের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকেও মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের কয়েকজনের মরদেহ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে।
বিস্ফোরণের সময় সিলিন্ডারের একটি অংশ ছিটকে গিয়ে রাস্তার পাশে থাকা জয়নব বেগম (৫৫) নামের এক নারীকে আঘাত করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে গুরুতর আহতদের কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুলবুল নামে এক ব্যক্তি মারা যান।
আশুলিয়া থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পাশের এলাকা থেকে আরও একজন নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গুরুতর আহত কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন পরে মারা যান। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা সাতজন বলে জানান তিনি।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ফায়ার সার্ভিস বিভাগীয়ভাবে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিতে একজন সহকারী পরিচালককে সভাপতি, একজন কমান্ডারকে সদস্যসচিব এবং সংশ্লিষ্ট সিনিয়র কর্মকর্তা ও ইন্সপেক্টরকে সদস্য করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা নির্ধারণ করা হবে।










