রাজধানীর গুলিস্তান যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার যানজট কমানোর উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হলেও বর্তমানে এর আশপাশের বিভিন্ন পয়েন্টে যানজটের চাপ বাড়ছে। ফ্লাইওভারের টোল প্লাজা, ওঠানামার র্যাম্প, সংযোগ সড়ক এবং বাস টার্মিনালকে ঘিরে নিয়মিত যান চলাচলে ধীরগতি তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্লাইওভারটি টোলমুক্ত করা, নিচের সড়ক প্রশস্ত করা, আন্তজেলা বাসের চলাচল পুনর্বিন্যাস এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের র্যাম্প কার্যকরভাবে ব্যবহারের মতো বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামছুল হকের প্রস্তুত করা একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ডিটিসিএর পর্যালোচনায় এসব সুপারিশ উঠে এসেছে। গত মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ফ্লাইওভারের যানজট পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে উপস্থাপনাও করা হয়।
ডিটিসিএর পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ফ্লাইওভারে টোল আদায়ের কারণে অনেক সময় যানবাহনের গতি কমে যায়। একই সঙ্গে টোল প্লাজার আশপাশের সড়কেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। তাই বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জনস্বার্থ বিবেচনায় ফ্লাইওভারটি টোলমুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে টোল আদায় চালু রাখার সিদ্ধান্ত হলে দ্রুতগতির ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে টোল পরিশোধের সময় কমিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। যদিও ডিটিসিএর পর্যালোচনায় আশঙ্কা করা হয়েছে, ইলেকট্রনিক টোল ব্যবস্থা চালু করলেও গুলিস্তান ও চানখাঁরপুলের মতো এক্সিট এলাকায় নতুন করে যানজট সৃষ্টি হতে পারে।
ফ্লাইওভারের ওপর আন্তজেলা বাসের চাপ কমাতেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের বিদ্যমান প্রবেশ ও বের হওয়ার র্যাম্পগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে বাসের জন্য টোলমুক্ত সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। রাজধানীর ভেতরে আন্তজেলা বাসের প্রবেশ ও অবস্থান কমাতে পারলে ফ্লাইওভারের ওপর যানবাহনের চাপ কমবে বলে মনে করছে ডিটিসিএ।
ফ্লাইওভারের নিচের সড়কগুলো প্রশস্ত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দোলাইরপাড়ের বিদ্যমান গোলচত্বরের আকার কিছুটা কমিয়ে সড়কের জায়গা বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল কাঠামোর কোনো ক্ষতি না করে ফ্লাইওভারের নিচের সড়কগুলো আরও প্রশস্ত করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে ডিটিসিএর মতে, শুধু ফ্লাইওভারের আশপাশের সড়ক প্রশস্ত করে দীর্ঘমেয়াদে রাজধানীর যানজটের সমাধান করা সম্ভব নয়। এজন্য ঢাকার চারপাশে একটি কার্যকর সার্কুলেশন নেটওয়ার্ক বা রিং রোড ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পর্যালোচনায় গাজীপুরের কড্ডা থেকে নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন পর্যন্ত মিডল রিং রোডের অংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কাঞ্চন থেকে ভুলতা পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলছে। ভুলতা থেকে মদনপুর হয়ে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু পর্যন্ত সড়ক রয়েছে, তবে এই অংশেরও প্রশস্ততা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
এ ছাড়া কড্ডা থেকে চন্দ্রা হয়ে হেমায়েতপুর পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক, গাবতলী থেকে বাবুবাজার সেতু হয়ে ইকুরিয়া এবং এন ৮ পর্যন্ত ইনার রিং রোডের বিভিন্ন অংশকে ভবিষ্যৎ যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে। রায়েরবাজার থেকে লোহারপুল পর্যন্ত উন্নয়নকাজ চলছে। লোহারপুল থেকে ইকুরিয়া পর্যন্ত বাবুবাজার সেতুসহ সড়ক উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলেও পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কেরানীগঞ্জ থেকে এন ৮ মাওয়া ভাঙ্গা পর্যন্ত বিদ্যমান সড়ক ব্যবহারের পাশাপাশি এন ৪ এর কালাকান্দি থেকে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু পর্যন্ত একটি নতুন সড়ক নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে বলেও মত দেওয়া হয়েছে।
ডিটিসিএর পর্যালোচনায় ফ্লাইওভারের নকশা ও বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়েও কিছু সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। ফ্লাইওভারের শেষ প্রান্ত এবং র্যাম্পের অবস্থান অধ্যাপক ড. শামছুল হকের প্রতিবেদনে দেওয়া সুপারিশ অনুযায়ী করা হয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. মশিউর রহমান বলেন, ফ্লাইওভারের মূল কাঠামোর কোনো ক্ষতি না করে নিচের সড়কের প্রশস্ততা বাড়ানো সম্ভব কি না, তা যাচাই করা হবে। তিনি জানান, টোল ব্যবস্থা থাকবে কি না, সে বিষয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থা ও সম্ভাব্য পরিবর্তন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক টোল ব্যবস্থার মাধ্যমে যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা যায় কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।










