নওগাঁয় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় প্রসূতির পেটের ভেতরে গজ কাপড় রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগে তরুণী রাহী মুনীর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে বুধবার ৭ অক্টোবর দুপুরে নওগাঁ সদর ১ নম্বর আমলি আদালতের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এই আদেশ দেন।
পরোয়ানাভুক্ত ছয় আসামি হলেন অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক ফাবলিহা সাদিয়া শাফীন, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডা. মো. আখেরুজ্জামান রবি, মেট্রো হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি মো. রিপন আলী, অপারেশন থিয়েটারের ইনচার্জ মোছা. সালমা বিবি নাজমা এবং দালাল চক্রের সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত মো. রাশেদুল ইসলাম হিরু ও মো. নাহিদ বাবু।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ এপ্রিল নওগাঁ শহরের দক্ষিণ সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা রাহী মুনী প্রসববেদনা নিয়ে নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তার পরিবার একটি দালাল চক্রের মাধ্যমে বেসরকারি একটি ক্লিনিকে চলে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। উন্নত চিকিৎসার কথা বলে মাত্র ৮ হাজার টাকার চুক্তিতে তাকে নওগাঁ শহরের মেট্রো হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেদিন রাতেই সেখানে তার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর রাহীর পেটের ভেতরে গজ ও তুলার অংশ রয়ে যায় এবং সেলাই করে দেওয়া হয়। এরপর তার পেট ফুলে ওঠে এবং তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা শুরু হয়। ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠলে পরদিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই অস্ত্রোপচারের সময় রাহীর পেটের ভেতরে থাকা গজ কাপড় বের করা হয় এবং পরে ক্ষতস্থান পুনরায় সেলাই করা হয়। তবে এর মধ্যে তার শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় অবস্থার উন্নতি হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাহী মুনীকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে সরেজমিন তদন্ত করা হয়। তদন্তে অস্ত্রোপচার করা মেট্রো হাসপাতালটি সরকারি নিবন্ধন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল বলে তথ্য উঠে আসে। প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলা এবং অনিবন্ধিত ক্লিনিক পরিচালনার অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
পরবর্তীতে গণমাধ্যমে ঘটনাটি প্রকাশিত হলে আদালতের নজরে আসে বিষয়টি। গত ১৩ এপ্রিল আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে ঘটনাটি আমলে নেন এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআইকে।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ২২ আগস্ট পিবিআই আদালতে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তদন্তে প্রসূতির অস্ত্রোপচার, পরবর্তী চিকিৎসা, হাসপাতাল পরিচালনা এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
বুধবার আদালত পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তা আমলে নেন। একই সঙ্গে মামলার ছয় আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
আদালতের এই আদেশের ফলে প্রসূতি রাহী মুনীর মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত চিকিৎসক, হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং দালাল চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে গেল। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত পরোয়ানাভুক্ত ব্যক্তিদের দোষী হিসেবে গণ্য করা যাবে না। মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে অভিযোগের বিচারিকভাবে সত্যতা নির্ধারণ হবে।










