ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড়, নিরাপত্তা জোরদার এবং বিক্ষোভকারীদের আটকের পরও থামছে না সরকারবিরোধী আন্দোলন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন ভোটার তালিকা সংশোধনের বিতর্ক ছাড়িয়ে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে বড় রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। তবে বিক্ষোভকারীরা নতুন কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা, বিরোধী দলের রাজনীতিক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ হাজারো মানুষকে আটক করা হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। পরে আটক ব্যক্তিদের অনেককে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে আটক ও মুক্তির বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের নাম বাদ পড়া, কারিগরি ত্রুটি এবং সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ জোরালো হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে দুজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এরপর থেকেই তাঁর পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, প্রবেশপথ ও প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড ও তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শহরজুড়ে ৩০ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার খবরও পাওয়া যায়।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং তাঁর সহযোগীদের আটক করার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি, শিক্ষার্থী সংগঠনের নেতা নেহা বোরাসহ কয়েকজনকে আটকের খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আটক এবং তাঁদের কিছু সরঞ্জাম জব্দ করার অভিযোগও উঠেছে। সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে।
আটক হওয়ার পর মুক্তি পেয়ে সিজেপির নেতারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভয় দেখিয়ে বা আটক করে তরুণদের জবাবদিহির দাবি থামানো যাবে না। দিল্লিতে নতুন বিক্ষোভ কর্মসূচির অনুমতি চাওয়া হলেও যন্তর মন্তরে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটি মুম্বাইসহ ভারতের অন্যান্য শহরেও আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে বিরোধী দলগুলোর জোট ইন্ডিয়া ব্লক, যার নেতৃত্বে রয়েছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী কয়েক মাস ধরেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে আসছেন। দলটির নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও বলেছেন, আটক বা দমনপীড়নের মাধ্যমে মানুষের প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে, বিজেপি বিক্ষোভকারীদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। দলটির বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে মৃত ব্যক্তিদের নাম, একাধিকবার থাকা নাম এবং যেসব ভোটারের ঠিকানা পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলো বাদ দেওয়ার জন্যই সংশোধন করা হয়েছে। বিজেপি আরও দাবি করেছে, নির্বাচনে তাদের সাফল্যের পেছনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভূমিকা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিজেপির দাবি, বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটার, একাধিকবার নিবন্ধিত নাম এবং যাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি, এমন ব্যক্তিরা রয়েছেন। তবে সমালোচকেরা সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে, নাকি কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি মেনে নেওয়া হলে বিরোধীদের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে আরও জোরালো হতে পারে। অন্যদিকে, আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হলে তা সরকারের ভাবমূর্তি ও জনসমর্থনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ভারতের রাজনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয় এবং সরকার কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে, তার ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
সূত্র: আল জাজিরা










