সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য এসেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্বস্তিদায়ক একটি ঘোষণা। এখন থেকে কোনো নিয়োগকর্তা (কফিল) যদি কোনো কারণে কর্মীর আকামা (রেসিডেন্স পারমিট) নবায়ন না করেন, তাহলে সেই কর্মী দ্রুত অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে আকামা নবায়নের সুযোগ পাবেন। এতে আর আগের মতো আইনি জটিলতায় পড়তে হবে না বলে জানিয়েছে সৌদি সরকার। নতুন এই সিদ্ধান্তকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মজীবনের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষায় একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন সৌদি আরবের মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি মিনিস্টার মুহান্নাদ বিন আহমেদ আল-ঈসা। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সৌদি আরবের ডেপুটি মিনিস্টার অব ফরেন কনস্যুলার ড. মোহাম্মদ এ. এম. আলশামেরিও। বৈঠকের শুরুতেই আল-ঈসা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এ সুখবরের ঘোষণা দেন।
তিনি জানান, কোনো কর্মীর কফিল যদি আকামা নবায়নে গড়িমসি করেন বা নবায়ন না করেন, তাহলে সেই কর্মী অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে দ্রুত আকামা নবায়ন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা থাকবে না। দীর্ঘদিন ধরে অনেক বাংলাদেশি কর্মী কফিলের অবহেলা বা অনীহার কারণে আকামা জটিলতায় পড়ে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে থাকতেন। নতুন সিদ্ধান্তে সেই সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবের সঙ্গে শ্রমবাজারে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করে। এর মধ্যে ছিল গৃহকর্মী নিয়োগ চুক্তির নবায়ন, শ্রম দক্ষতা যাচাইকরণ কর্মসূচি (এসভিপি) সম্প্রসারণ, সাধারণ কর্মী নিয়োগ চুক্তির পর্যালোচনা এবং যৌথ কমিশন ও যৌথ প্রযুক্তিগত কমিটির বৈঠক দ্রুত আয়োজনের আহ্বান।
এছাড়া বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে একটি সৌদি-বাংলাদেশ কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানে সৌদি আরবের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন, আরবি ভাষা শিক্ষা, সৌদি আইন, সংস্কৃতি ও কর্মপরিবেশ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে বাংলাদেশি কর্মীরা বিদেশে আরও দক্ষ ও প্রস্তুত হয়ে যেতে পারেন।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) এবং হসপিটালিটি খাতে দক্ষ জনবল নিয়োগ বাড়ানোরও অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে সময়মতো ওয়ার্ক পারমিট ও আকামা ইস্যু এবং নবায়ন নিশ্চিত করতে সৌদি সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়। কিছু নিয়োগকর্তা বাড়তি ফি-র অজুহাতে আকামা নবায়নে বিলম্ব করেন বলেও বৈঠকে তুলে ধরা হয়।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশি কর্মীরা সৌদি আরবের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন এবং একই সঙ্গে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছেন।
তিনি আরও বলেন, কওমি মাদ্রাসার অনেক শিক্ষার্থী আরবি ভাষায় দক্ষ। প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে তারাও সৌদি আরবের শ্রমবাজারে সফলভাবে কাজ করতে পারবেন। পাশাপাশি ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সৌদি আরবে বাড়তি জনশক্তির প্রয়োজন হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি দক্ষ কর্মী নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশের প্রস্তাবের জবাবে সৌদি আরবের ডেপুটি মিনিস্টার মুহান্নাদ বিন আহমেদ আল-ঈসা স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, আইটি ও হসপিটালিটি খাতে বাংলাদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় সৌদি সরকার ইতোমধ্যে ওয়েজ প্রটেকশন সিস্টেম এবং কর্মী বীমা (ইন্স্যুরেন্স) চালু করেছে। এছাড়া সৌদি কারাগারে আটক বাংলাদেশি কর্মীদের তথ্য কূটনৈতিক মাধ্যমে পাঠানো হলে সাধারণ ক্ষমার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
দুই দেশের এই বৈঠককে বাংলাদেশি প্রবাসীদের কর্মসংস্থান, অধিকার সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে আকামা নবায়ন সংক্রান্ত নতুন সুবিধা হাজারো বাংলাদেশি কর্মীর জন্য বাস্তবিক অর্থেই বড় স্বস্তি নিয়ে আসবে।










