তীব্র গরমে শরীর ঠান্ডা ও সতেজ রাখতে অনেকেই ডাবের পানিকে বেছে নেন। ডাবের পানিতে প্রাকৃতিকভাবে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ক্লোরাইড, ভিটামিন সি, অ্যামিনো অ্যাসিড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মতো বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। সুস্থ মানুষের জন্য এটি দৈনন্দিন পানীয় হিসেবে উপকারী হতে পারে। তবে সবার জন্য ডাবের পানি সমানভাবে নিরাপদ নয়।
বিশেষ করে কিডনি রোগী ও যাদের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি, তাদের ডাবের পানি পান করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ ডাবের পানিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পটাশিয়াম থাকে। সুস্থ কিডনি অতিরিক্ত পটাশিয়াম শরীর থেকে বের করে দিতে পারে। কিন্তু কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে পটাশিয়াম জমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কিডনি রোগীরা কেন সতর্ক থাকবেন
কিডনির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো শরীরে পানি, লবণ ও বিভিন্ন খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখা। কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত পটাশিয়াম গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এ কারণে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, রক্তে পটাশিয়াম বেড়ে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে এমন রোগী কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শে পটাশিয়াম গ্রহণ সীমিত করতে বলা হয়েছে—এমন ব্যক্তিদের ডাবের পানি নিয়মিত বা বেশি পরিমাণে পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক কিডনি রোগীর জন্য ডাবের পানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রোগীর কিডনির কার্যক্ষমতা, রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা, অন্যান্য শারীরিক সমস্যা ও চিকিৎসকের খাদ্যতালিকার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
ডায়রিয়ায় ডাবের পানি কি খাবার স্যালাইনের বিকল্প?
ডায়রিয়া, বমি, অতিরিক্ত ঘাম বা জ্বরের কারণে শরীর থেকে পানি ও বিভিন্ন ইলেক্ট্রোলাইট দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে। এ সময় শুধু পানি পান করলেই সবসময় শরীরে হারানো লবণ ও তরলের ঘাটতি পূরণ হয় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী তৈরি খাবার স্যালাইন বা ওআরএসে সোডিয়াম, গ্লুকোজ ও প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রোলাইট নির্দিষ্ট অনুপাতে থাকে। এই উপাদানগুলো অন্ত্রে পানি শোষণে সহায়তা করে। ফলে ডায়রিয়া বা বমির কারণে পানিশূন্যতা হলে খাবার স্যালাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে ডাবের পানিতে পটাশিয়াম থাকলেও সোডিয়ামের পরিমাণ খাবার স্যালাইনের মতো নয়। তাই ডায়রিয়ার সময় ডাবের পানিকে খাবার স্যালাইনের বিকল্প হিসেবে ধরা ঠিক নয়।
কখন ডাবের পানি উপকারী হতে পারে
সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে গরম আবহাওয়া, হালকা ব্যায়াম বা দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণে ডাবের পানি একটি ভালো প্রাকৃতিক পানীয় হতে পারে। এতে থাকা বিভিন্ন খনিজ উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
তবে শরীরে পানিশূন্যতা না থাকলে অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত ডাবের পানি পান করারও প্রয়োজন নেই। যেকোনো খাবার বা পানীয়ের মতো এটিও পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত।
খাবার স্যালাইনও প্রয়োজনের বাইরে নয়
পানিশূন্যতা না থাকলে নিয়মিত খাবার স্যালাইন পান করার প্রয়োজন নেই। খাবার স্যালাইন মূলত ডায়রিয়া, বমি বা শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ বেরিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হয়।
স্যালাইন খাওয়ার ক্ষেত্রে প্যাকেটের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ পরিষ্কার পানিতে তা মিশিয়ে নিতে হবে। ভুল অনুপাতে স্যালাইন তৈরি করলে এর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং শরীরের লবণের ভারসাম্যেও সমস্যা হতে পারে।
প্যাকেটজাত ডাবের পানি কিনলে সতর্কতা
তাজা ডাবের পানির পাশাপাশি বাজারে বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত ডাবের পানিও পাওয়া যায়। এসব পানীয় কেনার সময় লেবেলে থাকা উপাদান ও পুষ্টিগুণ দেখে নেওয়া ভালো। কিছু প্যাকেটজাত পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি বা অন্যান্য উপাদান থাকতে পারে।
সবশেষে, কিডনি রোগী, রক্তে পটাশিয়াম বেশি থাকা ব্যক্তি কিংবা পটাশিয়াম নিয়ন্ত্রণের খাদ্যতালিকায় থাকা ব্যক্তিদের ডাবের পানি পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। আর ডায়রিয়া বা বমির কারণে পানিশূন্যতা হলে ডাবের পানির ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার স্যালাইন গ্রহণ করা উচিত। গুরুতর পানিশূন্যতা, বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সূত্র: এনডিটিভি










