নেপালে বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত ৪৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং বিদেশি নাগরিকসহ আরও ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ নেপালে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে আপাতত এসব প্রস্তাব গ্রহণ না করে নিজেদের নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমেই উদ্ধার অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেপাল সরকার।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই মুহূর্তে তাদের বিদেশি উদ্ধারকারী দলের প্রয়োজন নেই। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে সহায়তার প্রস্তাব আসা স্বাভাবিক। তবে নেপালের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হওয়ায় আপাতত বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে না।
বুধবারের আকস্মিক বন্যায় চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলাসহ নেপালের বেশ কয়েকটি এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি নদীগুলোতে আকস্মিক পানির স্রোত নেমে আসার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনা, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বন্যায় বিভিন্ন দেশের নাগরিকও নিখোঁজ হয়েছেন। বিশেষ করে নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত দক্ষিণ কোরিয়ার নয়জন নাগরিকের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাদের উদ্ধারে দক্ষিণ কোরিয়া নেপালে একটি উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে সিউল ত্রাণসহায়তা পাঠানোর আগ্রহও প্রকাশ করেছে। তবে কাঠমান্ডু জানিয়েছে, আপাতত বিদেশি উদ্ধারকারী দল গ্রহণের পরিকল্পনা তাদের নেই।
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ নেপাল সরকারের কাছে তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল প্রবেশের অনুমতি চেয়েছে। কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও দিয়েছে। আরও অনেক দেশ উদ্ধার, ত্রাণ, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তবে নেপাল এখন মূলত নগদ অর্থ ও পুনর্গঠন সহায়তার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আরও বড় ধরনের আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা চাওয়া হবে।
বিদেশি উদ্ধারকারী দল গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। জাতিসংঘে নেপালের সাবেক রাষ্ট্রদূত দিনেশ ভট্টরাই মনে করেন, রাসুয়া জেলার ভৌগোলিক অবস্থান এ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একটি বিষয় হতে পারে। কারণ, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রাসুয়া চীনের তিব্বত অঞ্চলের সীমান্তবর্তী। স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকায় বিদেশি দলের প্রবেশ নিয়ে নিরাপত্তাজনিত বিবেচনা থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করেছেন।
তবে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমন ধারণা নাকচ করেছে। মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেছেন, বিদেশি উদ্ধারকারী দল গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে চীনের সীমান্ত বা কোনো ধরনের স্পর্শকাতরতার সম্পর্ক নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নেপালের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী বর্তমানে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় সক্ষম।
এএফপিকে দেওয়া বক্তব্যে ছেত্রী আরও জানান, এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে নিখোঁজদের সন্ধান করা এবং উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা। নেপালের নিরাপত্তা বাহিনী এ কাজে সক্ষম হলেও পরিস্থিতির প্রয়োজনে ভবিষ্যতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা চাওয়া হতে পারে।
তিনি বলেন, এমন নয় যে নেপালের কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন হবে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কার্যকরভাবে কাজ করছে। তাই আপাতত বিদেশি উদ্ধারকারী দল গ্রহণের প্রয়োজন দেখছে না সরকার।
এদিকে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এবং পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ইতোমধ্যে একাধিক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা নেপালকে অর্থসহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নেপাল সরকারের অবস্থান অনুযায়ী, বর্তমান অগ্রাধিকার হলো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান দ্রুত শেষ করা। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং দুর্গত এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়া হবে।
তবে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ থাকায় উদ্ধার অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ধ্বংসস্তূপ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে নিখোঁজদের সন্ধানে সময় লাগছে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হলে নেপাল সরকার বিদেশি বিশেষজ্ঞ বা উদ্ধারকারী দলের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা।










