রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। নিহত চারজনের সবার মুখ বীভৎস অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং মুখের আশপাশে তরল পদার্থ পড়ে থাকতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ওই তরল কোনো ধরনের রাসায়নিক কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। তবে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, নিহতদের মুখ প্রাথমিকভাবে বীভৎস অবস্থায় ছিল। মুখের আশপাশে কিছু তরল পদার্থও পাওয়া গেছে। এ কারণে তাদের শরীরে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬০), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী আগামী (২৬) ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)। শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১টার দিকে মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে পুলিশ তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় রোববার রংপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেছেন গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা তার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলেন। এরপর পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন শুক্রবার রাত ২টা ৪০ মিনিট থেকে শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে কোনো একসময় হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার রাতে পূজা তার বোনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পরিবারের চারজনের মোবাইল ফোন বন্ধ পান। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে তিনি স্বামী বিপুল আচার্যকে সঙ্গে নিয়ে বোনের বাড়িতে যান। বাড়িটি অন্ধকার এবং ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
পরে পূজা প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে ওঠেন। জানালার তালা ভেঙে টর্চের আলোয় ভেতরে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান, ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। একই সঙ্গে ভেতর থেকে পচা গন্ধও বের হচ্ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, আলমারি, শোকেস, আসবাবপত্র ও কাপড়চোপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পাওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন মাছুয়াপাড়া গ্রামের মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। মুগ্ধ রংপুর নগরের সিটি বাজারে একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। সিদ্ধার্থ প্রায় আট বছর ধরে একটি জুয়েলারির দোকানে সোনার কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের দাবি, ছাদে শব্দ শুনে গণপতি সেখানে গিয়ে তাদের বাধা দেন। এ সময় তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতেই তাকে হত্যা করা হয়। এরপর পরিবারের মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলেকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, গণপতি ও তার পরিবারের সদস্যরা অভিযুক্তদের চিনতেন। পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ওসি এ কে এম নাজমুল কাদের জানান, রোববার ভোরে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আটক করা হয়। পরে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তবে নিহতদের মুখের কাছে পাওয়া তরল পদার্থের প্রকৃতি এবং হত্যাকাণ্ডে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে সিআইডি। তদন্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা ও এর পেছনের উদ্দেশ্যও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।










