জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা। গত দুই মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৬টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এতে নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনে বিলম্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থের চাপ তৈরি হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কয়েকশ পরিবার। অনেক এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরির পর কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমারের পরিবর্তে নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের নির্ধারিত মূল্যের একটি অংশ পরিশোধ করতে হয়। কোনো এলাকায় একই ট্রান্সফরমার দ্বিতীয়বার চুরি হলে পুরো মূল্যও গ্রাহকদের বহন করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো আর্থিকভাবে বিপাকে পড়ছে।
জানা গেছে, গত ২ জুলাই থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাদারগঞ্জ জোনাল অফিসের আওতাধীন এলাকায় মোট ২৬টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই মাসে ছয়টি, আগস্টে ১৭টি এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনে তিনটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়। চুরি যাওয়া এসব ট্রান্সফরমারের বাজারমূল্য প্রায় ১৭ লাখ টাকা। সর্বশেষ ৫ সেপ্টেম্বর রাতে বালিজুড়ী ইউনিয়নের সুখনগরী এলাকায় একটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়।
পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা তামার তার ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর কারণেই চোরেরা এগুলোকে টার্গেট করছে। পরে ট্রান্সফরমার থেকে তামার কয়েলসহ মূল্যবান অংশ খুলে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
পল্লী বিদ্যুতের তথ্য অনুযায়ী, ৫ কেভিএ ক্ষমতার একটি ট্রান্সফরমারের মূল্য ৬৩ হাজার ৩৪৫ টাকা। ১০ কেভিএ ট্রান্সফরমারের দাম ৯০ হাজার ১২৫ টাকা, ১৫ কেভিএর দাম ১ লাখ ২ হাজার ৯৮০ টাকা এবং ২৫ কেভিএর দাম প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮০০ টাকা। ফলে নতুন ট্রান্সফরমারের অর্ধেক মূল্য পরিশোধ করাও নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাদারগঞ্জ পৌরসভার গ্রাবের গ্রাম আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা হৃদয় জানান, প্রকল্পটির অধিকাংশ বাসিন্দাই নিম্ন আয়ের। গত ২৯ আগস্ট সেখানে ট্রান্সফরমার চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমারের জন্য অর্ধেক টাকা দিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে না পারায় প্রকল্পের প্রায় ৪০টি পরিবার এখনো বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে।
জোড়খালী ইউনিয়নের চরগোলাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা সেলিম জানান, গত শুক্রবার রাতে তাদের এলাকার ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এরপর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
স্থানীয় এক বাসিন্দার অভিযোগ, অনেক সময় লোডশেডিংয়ের সুযোগ নিয়ে চোরেরা ট্রান্সফরমার থেকে কয়েল বা তামার তার খুলে নেয়। কখন লোডশেডিং হবে এবং কতক্ষণ থাকবে, তা চোরেরা কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে—এ নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। এ ঘটনায় বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো বর্তমান বা সাবেক কর্মী জড়িত থাকতে পারেন বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণের কথা তিনি উল্লেখ করেননি।
জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাদারগঞ্জ জোনাল অফিসের ডিজিএম সৈয়দা ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ২৮টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে দুটি, জুলাইয়ে ছয়টি, আগস্টে ১৭টি এবং সেপ্টেম্বরে তিনটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মাদারগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্নেহাশীষ রায় বলেন, গত প্রায় দুই মাসে ২৬টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। পাশাপাশি চুরি ঠেকাতে রাতের টহল বাড়ানো হয়েছে এবং একটি বিশেষ দলও মাঠে কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা বেড়েছে। রাতের টহল জোরদারের বিষয়ে থানার ওসির সঙ্গে কথা হয়েছে। চুরি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকেও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ট্রান্সফরমার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণসহ কারিগরি বিষয়গুলো পল্লী বিদ্যুতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই লোডশেডিংয়ের সময়সূচি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময়েও চোরচক্রের কাউকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং চুরি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।










