গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার পশ্চিম ঝাঝড় সাক্রাউরী এলাকায় একটি মাদ্রাসায় দুই শিক্ষার্থীকে মারধর ও গরম লোহার খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা দায়েরের পর মাদ্রাসার পরিচালকসহ তিন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মাদ্রাসা পরিচালক মাওলানা শোয়াইব হোসেন, শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান ও মো. শাহিন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পরিচালক শোয়াইব হোসেনকে শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হয় এবং শনিবার তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অপর দুই শিক্ষক হাবিবুর রহমান ও শাহিনকে শনিবার গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের রোববার আদালতে পাঠানোর কথা রয়েছে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, নির্যাতনের অভিযোগ ওঠা দুই শিক্ষার্থী হলো কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার সিংপুর গ্রামের নাজমুল মিয়ার ছেলে মো. বায়েজীদ এবং শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানার বানিয়াপাড়া গ্রামের মো. লাল মিয়ার ছেলে বোরহান আলী। দুজনেরই বয়স ১৩ বছর এবং তারা ওই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত।
মামলার এজাহার ও পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে মাদ্রাসার মাঠে কয়েকজন শিক্ষার্থী খেলাধুলা করছিল। একপর্যায়ে এক শিক্ষার্থীর পায়জামা অসাবধানতাবশত খুলে যায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বায়েজীদ ও বোরহানকে শাস্তির নামে মারধর ও নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেছে তাদের পরিবার।
বায়েজীদের বাবা নাজমুল মিয়ার অভিযোগ, তার ছেলেকে মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা শোয়াইব হোসেন ধরে নিয়ে মারধর করেন। পরে তাকে উলঙ্গ করে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পেটানো হয়। একপর্যায়ে আগুনে গরম করা লোহার খুন্তি দিয়ে বায়েজীদের নিতম্বে ছ্যাঁকা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাজমুল মিয়া জানান, ঘটনার পর বায়েজীদ বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের সদস্যদের জানায়নি। ১০ সেপ্টেম্বর রাতে মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফেরার পর তিনি দেখতে পান, তার ছেলে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে ও বসতে পারছে না। বিষয়টি জানতে চাইলে বায়েজীদ প্রথমে নিতম্বে ফোঁড়া হয়েছে বলে জানায়। পরে সেখানে ওষুধ লাগানোর সময় পরিবারের সদস্যরা পোড়া জখমের দাগ দেখতে পান। এরপর জিজ্ঞাসাবাদে মাদ্রাসায় নির্যাতনের ঘটনা জানতে পারেন বলে দাবি করেন তার বাবা।
অন্যদিকে বোরহানের বাবা মো. লাল মিয়ার অভিযোগ, খেলাধুলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার ছেলেকেও একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। সেখানে তার মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে হাত পা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর পোশাক খুলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মারধর করা হয়।
লাল মিয়ার আরও অভিযোগ, একপর্যায়ে মাদ্রাসার পরিচালক শোয়াইব হোসেন আগুনে উত্তপ্ত করা লোহার খুন্তি দিয়ে বোরহানের তলপেটে ছ্যাঁকা দেন। শিক্ষক হাবিবুর রহমান ও শাহিনও গরম খুন্তি দিয়ে তার উরু, নিতম্বসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দিয়ে জখম করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বোরহানের বাবা জানান, ১১ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি ছেলেকে দেখতে মাদ্রাসায় গেলে সংশ্লিষ্টরা তাকে জানান, বোরহানকে অন্য একটি শাখায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হওয়ায় তিনি মাদ্রাসার অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে জানতে পারেন, তার ছেলে গুরুতর আহত অবস্থায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। সেখানে গিয়ে তিনি বোরহানকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখতে পান।
ঘটনার পর দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে গাছা থানায় পৃথক মামলা করা হয়। মামলার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তিন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী জানান, বায়েজীদের পরিবারের করা মামলায় মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা শোয়াইব হোসেনকে শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হয়। শনিবার তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অপর মামলায় বোরহানের বাবা লাল মিয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষক হাবিবুর রহমান ও শাহিনকে শনিবার গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, দুই শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, দুই শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।










