ইউক্রেন যুদ্ধের পরিধি পেরিয়ে রাশিয়া ইউরোপের অন্য কোনো দেশে সংঘাত ছড়িয়ে দিতে পারে, এমন আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বেলারুশের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক মহড়া, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার, হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা এবং নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান, সব মিলিয়ে ইউরোপে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে রাশিয়া ও বেলারুশ পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী সুওয়ালকি গ্যাপের কাছে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে। পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী এই স্থলপথ বাল্টিক অঞ্চলের ন্যাটোভুক্ত দেশ লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়াকে জোটের অন্য সদস্যদের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত করেছে। কৌশলগত অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকাটি ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।
একই সময়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গোয়েন্দা ব্রিফিং করেন এবং রাশিয়ার কথিত ‘হাইব্রিড’ কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা বাড়ানোর পদক্ষেপ ঘোষণা করেন।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশের ওপর ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সেটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে। যুক্তরাজ্যও নাগরিকদের সম্ভাব্য যুদ্ধ বা বড় ধরনের সংকটের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে। দেশটির নাগরিকদের দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবার ও পানীয় জল মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জার্মানিও সম্ভাব্য রুশ হামলার পরিস্থিতি বিবেচনায় হাসপাতাল ও জরুরি সেবাব্যবস্থার প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ইউরোপের স্বাধীনতা ও শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে সামনে গুরুত্বপূর্ণ সময় আসছে বলে সতর্ক করেছেন। ঐতিহ্যগতভাবে নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডও নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করে প্রতিরোধক্ষমতা ও জাতীয় প্রস্তুতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘ধূসর অঞ্চলের’ বা সরাসরি যুদ্ধের নিচে থাকা কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগও রয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সাইবার হামলা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, ড্রোন ব্যবহার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রেও রুশ গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধের সীমা অতিক্রম না করেও প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া যাচাই করা সম্ভব। ন্যাটোর জন্যও এটি একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ, কারণ কোনো ঘটনার পর জোট কী মাত্রায় এবং কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা নিয়ে সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্যের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সুওয়ালকি গ্যাপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংকটের সময় এই করিডরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলে বাল্টিক দেশগুলোর সঙ্গে ন্যাটোর বাকি অংশের স্থল যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে অবশ্য বলেছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় জোট নিয়মিত সামরিক মহড়া চালায় এবং কোনো হামলার জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর। তবে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সদস্যদেশগুলোর ঐকমত্য কতটা দ্রুত তৈরি হবে, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে ইউরোপ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু সামরিক সরঞ্জাম থাকলেই হয় না। বিদ্যুৎ, খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা সচল রাখা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকটেও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম চালু রাখার সক্ষমতা প্রয়োজন। এ কারণে ন্যাটো জাতীয় পর্যায়ে ‘স্থিতিস্থাপকতা’ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে ন্যাটো বুঝতে চাইছে, দীর্ঘস্থায়ী হামলার মধ্যেও কীভাবে জরুরি সেবা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সচল রাখা যায়। ফলে যুদ্ধের প্রস্তুতি এখন শুধু সেনাবাহিনী ও অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বেসামরিক অবকাঠামো ও নাগরিক প্রস্তুতিও প্রতিরোধ কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও ইউরোপে আলোচনা রয়েছে। ওয়াশিংটন একই সময়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে বিভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা বিভিন্ন অঞ্চলে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে, তা নিয়েও ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে ভাবছে।
সব মিলিয়ে ইউরোপের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো দেখাচ্ছে, ইউক্রেনের বাইরে সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকিকে তারা এখন আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি অবকাঠামো, হাসপাতাল, নাগরিক সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে রাশিয়া ইউক্রেনের বাইরে সরাসরি সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়াকেই ইউরোপীয় দেশগুলো বর্তমানে নিরাপত্তা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে।









