কৈশোরে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের কারণে রাগ, অভিমান, খিটখিটে মেজাজ কিংবা মন খারাপের মতো আচরণ দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এসব পরিবর্তন কখন স্বাভাবিক বয়সজনিত অভিজ্ঞতা আর কখন বিষণ্নতার লক্ষণ, তা বোঝা অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের আচরণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে শুধু বয়সের প্রভাব ভেবে উপেক্ষা না করার পরামর্শ দিয়েছেন শিশু মনোবিজ্ঞানীরা।
হিন্দুস্তান টাইমসের লাইফস্টাইল বিভাগকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিশু মনোবিজ্ঞানী শ্রেয়া সিংহল জানিয়েছেন, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন বুঝতে তিনটি বিষয় খেয়াল করা প্রয়োজন। পরিবর্তন কত দিন ধরে চলছে, এর তীব্রতা কতটা এবং তা পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে।
কৈশোরে হরমোনের পরিবর্তন, পড়াশোনার চাপ, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং স্বাধীনভাবে চলার আকাঙ্ক্ষা থেকে মেজাজের ওঠানামা হতে পারে। অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা, যেমন বন্ধুর সঙ্গে মনোমালিন্য কিংবা পরীক্ষায় খারাপ ফলের কারণে কিশোর-কিশোরীরা সাময়িকভাবে মন খারাপ করতে পারে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে তাদের আচরণও সাধারণত স্বাভাবিক হয়ে আসে।
তবে বিষণ্নতার ক্ষেত্রে মন খারাপ বা খিটখিটে মেজাজ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। টানা দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে দিনের বেশির ভাগ সময় মন খারাপ থাকা, হতাশা অনুভব করা কিংবা নিজেকে অন্যদের কাছ থেকে গুটিয়ে নেওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়
কিশোর-কিশোরীদের বিষণ্নতা সব সময় কান্না বা বিষণ্ন মুখের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রাগ, বিরক্তি, ঘন ঘন ক্ষোভ প্রকাশ কিংবা অল্পতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ার মধ্য দিয়েও মানসিক কষ্ট প্রকাশ পেতে পারে।
এ ছাড়া আগে যেসব কাজ, খেলা বা শখে আনন্দ পেত, সেগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা বিষণ্নতার সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে। ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়া, ফলাফল খারাপ হওয়া এবং নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়াও সতর্ক হওয়ার মতো বিষয়।
কিছু কিশোর-কিশোরী বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের এড়িয়ে চলতে শুরু করে। আবার কারও ক্ষেত্রে মাথাব্যথা বা পেটব্যথার মতো শারীরিক অভিযোগও দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণের এক বা একাধিকটি থাকলেই বিষণ্নতা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সন্তানের স্বাভাবিক আচরণের তুলনায় পরিবর্তন কতটা দীর্ঘস্থায়ী এবং তা জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, সেটি বিবেচনা করা জরুরি।
সন্তানের পাশে থাকবেন যেভাবে
সন্তানের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন বুঝতে অভিভাবকদের ধৈর্যশীল ও সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন। সন্তানের কষ্টকে সাময়িক সমস্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া কিংবা তার অনুভূতিকে তুচ্ছ করা উচিত নয়। এতে সে নিজের সমস্যার কথা বলতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।
সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। শুরুতেই উপদেশ দেওয়া বা সমস্যার সমাধান চাপিয়ে না দিয়ে তাকে নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, ‘ইদানীং তোমাকে একটু মনমরা লাগছে, কী হয়েছে বলবে?’ এ ধরনের সহজ ও আন্তরিক প্রশ্ন দিয়ে কথোপকথন শুরু করা যেতে পারে।
পাশাপাশি সন্তানের ঘুম, খাওয়াদাওয়া, পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেদিকে নজর রাখা দরকার। তাকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে সে নির্ভয়ে নিজের অনুভূতি ও সমস্যার কথা বলতে পারে।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?
সন্তানের মন খারাপ বা আচরণগত পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হলে, ক্রমে বাড়তে থাকলে কিংবা পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন কাজে বাধা সৃষ্টি করলে শিশু বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে সন্তান নিজের ক্ষতি করার কথা বললে, আত্মহত্যার চিন্তা প্রকাশ করলে কিংবা বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই বলে জানালে বিষয়টি কখনোই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত পেশাদার সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাকে একা না রাখাই জরুরি।
কৈশোরের প্রতিটি মেজাজ পরিবর্তন বিষণ্নতার লক্ষণ নয়। তবে সন্তানের আচরণে দীর্ঘস্থায়ী ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে তার পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো লক্ষণ শনাক্ত করা, পরিবারের সমর্থন এবং যথাযথ চিকিৎসা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।
দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ সচেতনতামূলক তথ্যের জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস










