উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, এই রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষই দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ বুঝতে পারেন না। ফলে রোগ শনাক্ত না হওয়ায় তারা সময়মতো চিকিৎসা নেন না। ইংল্যান্ডে প্রায় ১৪ লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের প্রায় ৫৯ শতাংশই জানেন না যে তাদের এই সমস্যা রয়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের গবেষকেরা ‘আওয়ার ফিউচার হেলথ’ কর্মসূচির আওতায় ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ ফল পেয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ইংল্যান্ডের প্রাপ্তবয়স্কদের এক তৃতীয়াংশের বেশি উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, সিস্টোলিক রক্তচাপ ১৪০ মিলিমিটার পারদ বা তার বেশি কিংবা ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ৯০ মিলিমিটার পারদ বা তার বেশি হলে উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষণায় রক্তচাপ কমানোর ওষুধ গ্রহণকারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গবেষণায় বয়সের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়তে দেখা গেছে। ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৫ শতাংশের এই সমস্যা রয়েছে। অন্যদিকে, ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার ৭১ শতাংশ। বয়সের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি পাওয়া গেছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৪২ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৯ শতাংশ।
ওষুধ গ্রহণের পরও নিয়ন্ত্রণে নেই অনেকের রক্তচাপ
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ গ্রহণকারীদের অর্ধেকের রক্তচাপও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নেই। এক বা একাধিক ওষুধ সেবনের পরও তাদের রক্তচাপ ১৪০/৯০ বা তার বেশি রয়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও চিকিৎসা পরিসংখ্যানবিদ ওয়েনইউ লিউ বলেন, উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও চিকিৎসার প্রচলিত পদ্ধতি নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে রোগটি শনাক্ত করার দিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে নিয়মিত সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ ৪০ বছর বয়স থেকে শুরু হয়। ফলে এর চেয়ে কম বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত না হওয়ার ঝুঁকি থাকে। গবেষকেরা কম বয়স থেকেই রোগ শনাক্তের ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
‘আওয়ার ফিউচার হেলথ’ কর্মসূচির উপপ্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ইয়ান টার্নবুলের মতে, অনেক রোগীর উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হয় না, আবার কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসা চললেও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে না। তাই শুধু রক্তচাপের মাত্রা নয়, ব্যক্তির হৃদ্রোগ ও রক্তনালির রোগের সামগ্রিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা কর্মকর্তা অধ্যাপক ব্রায়ান উইলিয়ামস জানিয়েছেন, উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্রোগের অন্যতম প্রধান পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি। যুক্তরাজ্যে প্রায় অর্ধেক হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের সঙ্গে এই সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং ওষুধ গ্রহণের পরও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।










