ভারতের তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের সাম্প্রতিক দুই দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ ও কফি আড্ডা, পরদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে মেট্রোযাত্রা ও মন্দির পরিদর্শন। পরপর দুই নেতার সঙ্গে বিজয়ের এই উপস্থিতিকে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।
তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম বা টিভিকে দলের নেতৃত্বে তামিলনাড়ুতে সরকার পরিচালনা করছেন বিজয়। তাঁর সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে কংগ্রেস। ফলে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকটি দুই দলের রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প ও অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে সহযোগিতা বজায় রাখাও বিজয়ের সরকারের জন্য জরুরি।
শনিবার (১০ অক্টোবর) চেন্নাই সফরে যান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সময় তিনি মেট্রোরেল প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বিজয় তাঁর সঙ্গে মেট্রোতে ভ্রমণ করেন এবং পরে আইআইটি মাদ্রাজ ক্যাম্পাসের একটি মন্দির পরিদর্শন করেন। সফরে প্রায় ১৩ হাজার কোটি রুপির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কর্মসূচি ছিল।
এর আগের দিন রাহুল গান্ধীর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ ও কফি আড্ডায় অংশ নেন বিজয়। দুই নেতার বৈঠককে টিভিকে ও কংগ্রেসের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হওয়া জল্পনা প্রশমনের উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
তবে বিজয়কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান বলে টিভিকের কিছু নেতাকর্মীর স্লোগান কংগ্রেসের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। কংগ্রেস ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে সামনে আনার চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে, বিজয়ের সমর্থকদের একটি অংশও তাঁকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে দেখতে আগ্রহী। যদিও টিভিকে জানিয়েছে, এ ধরনের স্লোগান দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়, বরং কিছু কর্মীর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।
বিজয় বিজেপিকে তাঁর দলের আদর্শিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বর্ণনা করলেও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে তাঁকে। রাজ্যের উন্নয়ন, অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং কেন্দ্রীয় বরাদ্দের মতো বিষয়ে সহযোগিতা ছাড়া অগ্রগতি কঠিন। এ কারণে রাজনৈতিক মতপার্থক্য বজায় রেখেও প্রশাসনিক সম্পর্ক কার্যকর রাখতে চাইছে তাঁর সরকার।
টিভিকে নেতা ও বিদ্যুৎমন্ত্রী নির্মল কুমারের ভাষ্য অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নের স্বার্থে প্রয়োজনে সমঝোতা করতে প্রস্তুত সরকার। তাঁর ব্যাখ্যায়, রাহুলের সঙ্গে বৈঠক ছিল রাজনৈতিক সম্পর্কের অংশ, আর মোদির সঙ্গে মেট্রোযাত্রা ছিল সরকারি কর্মসূচি।
চেন্নাই সফরে মোদি জানান, অতীতে জয়ললিতা, এডাপ্পাদি কে পালানিস্বামী এবং এম কে স্টালিনের সরকারের সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন। রাজ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা বলেন তিনি।
এদিকে বিজয় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে আটকে থাকা কেন্দ্রীয় তহবিল ছাড়, তিনটি মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা, মাদ্রাজ হাইকোর্টে তামিল ভাষার ব্যবহার ও মর্যাদা বৃদ্ধি এবং চেন্নাই মেট্রোর তৃতীয় পর্যায়ের অনুমোদন। পাশাপাশি মাদুরাই ও কোয়েম্বাটোরে মেট্রোরেল প্রকল্প এবং তামিলনাড়ুর হোসুরের সঙ্গে কর্ণাটকের বোম্মাসান্দ্রাকে যুক্ত করে আন্তরাজ্য মেট্রো চালুর দাবিও জানিয়েছেন তিনি। এসব বিষয়ে মোদির কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিজয়ের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো কংগ্রেসের সমর্থন ধরে রাখা, কেন্দ্রের সঙ্গে উন্নয়নমূলক সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় রাজনীতিতে নিজের সম্ভাব্য অবস্থান তৈরি করা। রাহুলের সঙ্গে কফি আড্ডা ও মোদির সঙ্গে মেট্রোযাত্রা তাঁর এই বহুমুখী রাজনৈতিক সমীকরণকে সামনে এনেছে। তবে এই কৌশল ভবিষ্যতে তাঁকে কতটা রাজনৈতিক সুবিধা দেবে, তা নির্ভর করবে জোটের স্থায়িত্ব, কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ২০২৯ সালের নির্বাচনি পরিস্থিতির ওপর।










