নেপালে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী, রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষ।
দেশটির মাধেশ প্রদেশে গত সপ্তাহে শিশুটি নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের তিন দিন পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকেই ঘটনার প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক বিক্ষোভ শুরু হয়। স্থানীয় পুলিশের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, শিশুটির হত্যা ও যৌন নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে পুলিশি হেফাজতে থাকা এক কিশোর সন্দেহভাজনের বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।
সিমারা শহরে কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ চলার পর নিহত শিশুটির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর একটি লিখিত সমঝোতা হয়। সেখানে সরকার গুরুতর অপরাধসংক্রান্ত আইন পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে নিহত শিশুটির স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কথাও জানানো হয়েছে।
এই ঘটনা নেপালে অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের বিচার ও শাস্তির বিষয়টিকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ধর্ষণ ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে অপ্রাপ্তবয়স্ক কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তার ক্ষেত্রে কী ধরনের শাস্তি কার্যকর হওয়া উচিত, তা নিয়ে দেশটির অধিকারকর্মীদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ আরও কঠোর শাস্তির দাবি তুললেও মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি চালুর বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী গৌরী প্রধান ঘটনাটিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এমন নৃশংস ঘটনায় জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রমে ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
এদিকে পুলিশি হেফাজতে থাকা কিশোর সন্দেহভাজনের ভিডিও কীভাবে বাইরে ছড়িয়ে পড়ল, তা নিয়েও তদন্ত চলছে। বারা জেলার প্রধান জেলা কর্মকর্তা ধর্মেন্দ্র কুমার মিশ্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, ভিডিও ফাঁসের ঘটনায় পুলিশের একজন সদস্যের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে অন্য কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
নেপাল পুলিশের পরিসংখ্যানও দেশটিতে যৌন সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ২৫ হাজার ৫০০টির বেশি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২০০টিরও বেশি ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীর বয়স ছিল ১০ বছরের কম।
তিন বছরের শিশুকে ঘিরে এই মর্মান্তিক ঘটনা তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং শিশুদের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি এবং গুরুতর অপরাধের বিচারব্যবস্থা নিয়ে নেপালে নতুন করে জাতীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।










