জন্ডিস ধরা পড়লেই অনেক পরিবারে রোগীর খাবারের তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। সাধারণত ধারণা করা হয়, এ সময় শুধু সেদ্ধ, তেল-মসলাবিহীন ও একেবারে স্বাদহীন খাবার খাওয়াতে হবে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্ডিসের চিকিৎসায় শুধু মসলা বাদ দেওয়াই সমাধান নয়; বরং রোগের কারণ অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জন্ডিস মূলত কোনো রোগ নয়, এটি একটি উপসর্গ। যখন লিভার রক্তে থাকা বিলিরুবিন নামের রঞ্জক পদার্থ স্বাভাবিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না, তখন ত্বক, চোখ এবং প্রস্রাবে হলুদাভ ভাব দেখা দেয়। ভাইরাল সংক্রমণ, লিভারের প্রদাহ, পিত্তনালিতে বাধা কিংবা অন্যান্য জটিলতার কারণে জন্ডিস হতে পারে। তাই খাবার নয়, বরং লিভারের সমস্যাই এর মূল কারণ।
অনেকেই মনে করেন, রান্নায় সামান্য মসলা ব্যবহার করলেই লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। হলুদ, জিরা, ধনিয়া বা আদার মতো হালকা মসলা পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করলে সাধারণত কোনো সমস্যা হয় না। বরং এসব উপাদান হজমে সহায়তা করতে পারে। তবে অতিরিক্ত ঝাল, বেশি তেলযুক্ত, ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ এসব খাবার হজমে সময় নেয় এবং শরীরে অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে।
জন্ডিসে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুষম ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়া। দিনে একসঙ্গে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খাবার গ্রহণ করা ভালো। পর্যাপ্ত পানি, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, স্যুপ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর তরল শরীরকে আর্দ্র রাখে এবং লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। পাশাপাশি মৌসুমি ফল, শাকসবজি, ভাত, রুটি, ডাল, মাছ এবং চর্বিহীন মাংস পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।
লিভারের কোষ পুনর্গঠনে প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডাল, ডিম, মাছ কিংবা অন্যান্য চর্বিহীন প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত। তবে অ্যালকোহল, অতিরিক্ত কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত তেলযুক্ত ফাস্টফুড সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা প্রয়োজন, কারণ এগুলো লিভারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্ডিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো লোকমুখে প্রচলিত পরামর্শের ওপর নির্ভর করা। রোগের ধরন ও কারণ অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি। যদি দীর্ঘদিন জ্বর, তীব্র দুর্বলতা, বমি, পেটব্যথা বা জন্ডিসের লক্ষণ বাড়তে থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
অতএব, জন্ডিস হলেই সব ধরনের মসলা সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং পরিমিত, পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলাই দ্রুত সুস্থ হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।










