রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হলেও সেই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রবাসী কল্যাণ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব: রাজনীতিতে নারী ও তরুণ’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
নুরুল হক নুর বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশে নতুনভাবে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে সাজানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগের পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকজন তরুণকে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে তাদের ক্ষমতায়নের চেষ্টা করলেও বৃহত্তর তরুণ জনগোষ্ঠীকে সেই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে তরুণদের পাশাপাশি নারীদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের যথাযথ স্বীকৃতি ও রাজনৈতিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, তরুণরা যদি সরাসরি ক্ষমতার অংশ হওয়ার পরিবর্তে একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করতে পারত, তাহলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তরুণদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার পাশাপাশি তাদের দক্ষতা ও নেতৃত্বের বিকাশে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
তরুণদের কর্মসংস্থানে গুরুত্ব
নুরুল হক নুর শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা এবং তাদের জন্য দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
তিনি জানান, প্রবাসী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন নতুন দেশ ও খাত খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে সরকার। একই সঙ্গে জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো এবং ঋণসহায়তার সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নারীর নিরাপত্তা ও সাইবার আইন সংস্কারের দাবি
নারীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর বক্তব্য, চরিত্রহনন ও উগ্র রাজনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন নুরুল হক নুর।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে তাদের নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের হয়রানি ও অবমাননার ঘটনা মোকাবিলায় কার্যকর আইন ও ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সাইবার আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের ক্ষমতা দিতে হবে
সংলাপে সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান বলেন, প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেই হবে না; সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাদের কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনের সময় নারীদের সামনে আনা হলেও ক্ষমতার মূল জায়গাগুলোতে তাদের যথাযথ অবস্থান দেওয়া হয় না। ফলে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক সময় প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে।
গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। অতীতের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার না করে তরুণদের সামনে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রবীণ রাজনীতিকদের অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগাতে হবে।
জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, তরুণদের শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এলেই হবে না, তাদের দায়িত্বশীল নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। নারীদের চরিত্রহনন ও বিদ্রুপের সংস্কৃতি বন্ধ করে তাদের মেধা, যোগ্যতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে মূল্যায়ন করার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, জাতীয় সংসদে তরুণদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব না থাকা রাজনৈতিক ব্যর্থতার বিষয়। অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের সঙ্গে তরুণদের কাজের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারে নারীদের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও তাদের কার্যকর ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন বলেন, দেশের বৈচিত্র্য ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে নারী ও তরুণদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। জাতীয় সংসদে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ এবং রাজনৈতিক পদে বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশে নারী নেতৃত্বাধীন সরকার থাকলেও জাতীয় রাজনীতিতে নারীদের কাঙ্ক্ষিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে রুয়ান্ডার মতো দেশের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশেও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
গোলটেবিল সংলাপে রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, অধিকারকর্মী, ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা অংশ নেন। আলোচনায় রাজনীতিতে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণের প্রতিবন্ধকতা দূর করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ক্ষমতায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন দিক উঠে আসে।










