দুপুরে খাবার খাওয়ার পর অনেকেরই হঠাৎ চোখে ঘুম নেমে আসে। পেট ভরে খাওয়ার পর শরীর ভারী লাগা, কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করা—এ ধরনের অভিজ্ঞতা বেশ পরিচিত। অনেকে একে মজা করে ‘ফুড কোমা’ বললেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে খাবারের পর দেখা দেওয়া এই তন্দ্রাভাবকে বলা হয় ‘পোস্টপ্রান্ডিয়াল সোমনোলেন্স’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার খাওয়ার পর শরীর হজমের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময় অন্ত্র থেকে বিভিন্ন সংকেত, হরমোনের পরিবর্তন, রক্তে পুষ্টি উপাদানের প্রবাহ এবং প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমের মতো বেশ কিছু শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে। এসব কারণেই খাবারের পর কিছুটা ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিতে পারে।
হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন চিকিৎসক ডা. আইলিন ক্যান্ডে। তার মতে, সাধারণত খাবার খাওয়ার এক থেকে দুই ঘণ্টা পর তন্দ্রাভাব বেশি অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে একসঙ্গে বেশি পরিমাণ খাবার খেলে এ ধরনের অনুভূতি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে শুধু খাবারের পরিমাণই এর একমাত্র কারণ নয়।
রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, শরীরের সার্কাডিয়ান ছন্দ, পানিশূন্যতা এবং অ্যালকোহল গ্রহণও দুপুরের খাবারের পর ঘুমভাব বাড়াতে পারে। এ ছাড়া কিছু ধরনের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও অতিরিক্ত তন্দ্রাভাব দেখা দিতে পারে।
রক্তে শর্করার ওঠানামার প্রভাব
খাবারের ধরনও খাবারের পর ঘুমভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট ও চিনি বেশি থাকা খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এরপর ইনসুলিনের প্রভাবে তা দ্রুত কমে গেলে কারও কারও অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঘুমভাব অনুভূত হতে পারে। এ অবস্থাকে ‘রিঅ্যাকটিভ হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ বলা হয়।
সাদা ভাত, পেস্ট্রি এবং চিনিযুক্ত পানীয়ের মতো খাবারে দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার পাকস্থলী থেকে খাবার বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে। বেশি পরিমাণ প্রোটিন গ্রহণের ক্ষেত্রেও শরীরে ট্রিপটোফ্যানের মাত্রা বাড়তে পারে, যা সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত।
দুপুরের পর সতেজ থাকার উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের পর দীর্ঘসময় সতর্ক ও কর্মক্ষম থাকতে হলে খাদ্যতালিকায় শস্য, প্রোটিন ও চর্বির পরিমিত সমন্বয় রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি একবারে অতিরিক্ত খাবার না খেয়ে পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং রাতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে খাবারের পর ঘুম পেলেই সেটিকে ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। মাঝে মধ্যে বড় খাবারের পর কিছুটা ক্লান্তি বা তন্দ্রাভাব স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে।
কিন্তু প্রতিবার খাবার খাওয়ার পর তীব্র ক্লান্তি দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে এর সঙ্গে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, অস্বাভাবিক ওজন বাড়া বা কমা, ঝাপসা দেখা কিংবা মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এসব উপসর্গের পেছনে ইনসুলিন প্রতিরোধ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা থাকতে পারে। এ ছাড়া থাইরয়েডের কার্যকারিতায় সমস্যা কিংবা শনাক্ত না হওয়া ঘুমের সমস্যাও খাবারের পর অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণ হতে পারে।
তাই দুপুরের খাবারের পর সাময়িক ঘুমভাব সাধারণত উদ্বেগের বিষয় না হলেও, এটি যদি নিয়মিত ও তীব্র আকার ধারণ করে বা অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে কারণ খুঁজে বের করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।










