দূর থেকে দেখলে মনে হয় সমুদ্রের ধারে গড়ে ওঠা কোনো আধুনিক কৃত্রিম নগরী। সারি সারি উঁচু ভবন, অভিন্ন নকশার অ্যাপার্টমেন্ট আর বিস্তৃত সড়ক—সবকিছুই যেন একটি পরিকল্পিত স্বপ্নের শহরের ছবি তুলে ধরে। কিন্তু কাছে গেলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। নীরব রাস্তা, খালি ভবন, ধুলায় ঢাকা অ্যাপার্টমেন্ট আর খুব কম মানুষের উপস্থিতি শহরটিকে দিয়েছে ‘ভুতুড়ে শহর’-এর পরিচিতি। মালয়েশিয়ার উপকূলে সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি গড়ে ওঠা ফরেস্ট সিটির বর্তমান চিত্র এখন আরও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ জনশূন্যতার সুযোগ নিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের কার্যক্রম।
চীনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কান্ট্রি গার্ডেন ২০১৬ সালে বিশাল এই আবাসন প্রকল্পের উদ্বোধন করে। প্রকল্পটিকে তখন ‘সমগ্র মানবজাতির স্বপ্নের স্বর্গ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। প্রায় ১৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় গড়ে তোলা এই মেগা প্রকল্পে প্রায় সাত লাখ মানুষের বসবাসের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রকল্প শুরুর প্রায় এক দশক পরও সেই লক্ষ্যের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি ফরেস্ট সিটি। স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন প্রতিবেদনের হিসাবে, প্রকল্পটির বাসিন্দা এখনো কয়েক হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
প্রকল্পটির প্রথম দিকের বিনিয়োগকারীদের একজন জেসন ডেং। তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করে পাঁচটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে নিজের বিনিয়োগ নিয়ে হতাশ তিনি। তাঁর ভাষ্য, প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এমন হবে জানলে এতগুলো সম্পত্তি কিনতেন না।
ফরেস্ট সিটির জনশূন্য পরিবেশই এখন অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জুলাইয়ের মাঝামাঝি মালয়েশিয়ার পুলিশ শহরটির ৩২টি স্থাপনায় অভিযান চালিয়ে দুটি বড় প্রতারণা চক্রের সন্ধান পায়। অভিযানে ৩৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় বিপুলসংখ্যক কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও মডেমসহ প্রায় ১০ লাখ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত মূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়।
পুলিশের অভিযোগ, এসব স্থাপনা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগ এবং কথিত প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে প্রতারণা চালানো হচ্ছিল। একটি আবাসিক ভবনের পঞ্চম তলার ২৭টি অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে একটি কল সেন্টার পরিচালিত হচ্ছিল। আরেকটি প্রতারণা কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছিল পাঁচটি বাংলো থেকে। অর্থাৎ বাইরে থেকে এগুলো সাধারণ আবাসিক স্থাপনা মনে হলেও ভেতরে চলছিল সংগঠিত অনলাইন অপরাধের কার্যক্রম।
অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩০৯ জন চীনা, ১৯ জন ইন্দোনেশীয়, তিনজন মালয়েশীয় এবং চারজন মিয়ানমারের নাগরিক বলে জানিয়েছে পুলিশ। জোহর পুলিশের প্রধান আব রহমান আরসাদ জানান, চক্রটির মূল হোতাকে শনাক্ত করতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সঙ্গে কাজ করছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফরেস্ট সিটিতে শনাক্ত হওয়া চক্রগুলো সম্ভবত আরও বড় আন্তর্জাতিক অপরাধী নেটওয়ার্কের একটি অংশ। ক্রিপ্টো অপরাধ বিশ্লেষক জন ওয়াজিকের ভাষ্য, আধুনিক প্রতারণা চক্রগুলো এখন আর ছোটখাটো অপরাধী দলের মতো পরিচালিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আদলে পরিচালিত হয়। তাদের আলাদা নিয়োগ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি বিভাগ, অর্থপাচার ব্যবস্থাপনা এবং নিজস্ব অবকাঠামো থাকে।
ফরেস্ট সিটির মতো জায়গা এ ধরনের অপরাধীদের জন্য বিশেষভাবে সুবিধাজনক। কারণ বিপুলসংখ্যক খালি অ্যাপার্টমেন্ট, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক যাতায়াতের সুবিধা এবং বিলাসবহুল আবাসিক এলাকার পরিচিতি—সবকিছু মিলিয়ে অপরাধমূলক কার্যক্রম আড়াল করার সুযোগ তৈরি হয়। একই ভবনের এক অংশে বৈধ আবাসিক কার্যক্রম চললেও অন্য অংশে গোপনে পরিচালিত হতে পারে বড় ধরনের প্রতারণা কেন্দ্র।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করছেন, ফরেস্ট সিটির কিছু চক্রের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের অনলাইন প্রতারণা নেটওয়ার্কের যোগাযোগ থাকতে পারে। বিশেষ করে কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের বিস্তার ঘটেছে। এসব নেটওয়ার্কে বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষকে প্রতারণা করে বা কখনো পাচারের মাধ্যমে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক অনলাইন অপরাধে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।
তবে ফরেস্ট সিটির পরিস্থিতি কম্বোডিয়া বা মিয়ানমারের কুখ্যাত প্রতারণা কম্পাউন্ডগুলোর তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। এখানে কথিত প্রতারণা কেন্দ্রগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধী ক্যাম্পে নয়, বরং সাধারণ কনডোমিনিয়াম, অ্যাপার্টমেন্ট ও বাংলোর ভেতরে পরিচালিত হচ্ছিল। ফলে অপরাধীদের কার্যক্রম সাধারণ মানুষের বসবাসের আড়ালেই চলতে পারত।
শহরটির সম্পত্তি বিক্রয়কর্মী কেভিনের দাবি, এখনো কিছু কনডোমিনিয়াম ও সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্টে প্রতারণামূলক কার্যক্রম চালু রয়েছে। তাঁর মতে, ফরেস্ট সিটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর জনশূন্যতা। কোম্পানির পক্ষ থেকে একসময় ২৩ হাজার বাসিন্দার কথা বলা হলেও বাস্তবে সেখানে পাঁচ হাজারেরও কম মানুষ বসবাস করেন বলে তিনি দাবি করেন।
ফরেস্ট সিটির বর্তমান অবস্থার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারি, চীনের আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট এবং নাগরিকদের বিদেশে অর্থ বিনিয়োগের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ প্রকল্পটির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের বিস্তার ঘটেনি। মূল পরিকল্পনার মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে বলে জানা যায়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে শহরটিতে মানুষের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে। সিঙ্গাপুর থেকে আসা বাসিন্দা ফিলিপের মতে, কয়েক মাস আগেও ২০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে হয়তো একটি ফ্ল্যাটে আলো জ্বলত। এখন পাঁচটি ফ্ল্যাটের মধ্যে অন্তত একটিতে আলো দেখা যায়। তাঁর চোখে, ফরেস্ট সিটি ধীরে ধীরে আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
তবু এই পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ঝুঁকিও সামনে এসেছে। বিলাসবহুল স্বপ্নের শহর হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার কথা ছিল যে ফরেস্ট সিটির, সেটিই যদি সংগঠিত আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে, তাহলে প্রকল্পটির ব্যর্থতার গল্প আরও জটিল হয়ে উঠবে। তাই শহরটিকে পুনরায় বসবাসযোগ্য ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় করার পাশাপাশি অপরাধী নেটওয়ার্কের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করাও এখন মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।










