বাংলাদেশে চলতি অর্থবছর ২০২৬-২৭ এ গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির হিসাবে, এই হার গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার আগে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট বেশি হতে পারে। অন্যদিকে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা সরকারের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম।
এর আগে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে এপ্রিলে পূর্বাভাস দিয়েছিল আইএমএফ। নতুন প্রতিবেদনে সেই পূর্বাভাস ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট কমানো হয়েছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে একই ধরনের সতর্ক পূর্বাভাস দিয়েছে অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাও।
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ করেছে। অন্যদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) গত সেপ্টেম্বরে তাদের পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে।
আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৯২ শতাংশ। এরপর অধিকাংশ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কের মধ্যে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আবার বেড়েছে।
আইএমএফের আঞ্চলিক পূর্বাভাস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৭ সালের জন্য পূর্বাভাস পাওয়া ১৯১টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থান হতে পারে ২০তম। এ তালিকায় ভেনেজুয়েলার মূল্যস্ফীতি ১৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ, সুদানের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ইরানের ৪২ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বৈশ্বিক অবস্থা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পণ্যের সরবরাহ ব্যয় কমাতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।
তার মতে, শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বাজার তদারকি, খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি, লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ও রেশনিং ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থির আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবিকা রক্ষায় এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে আইএমএফ আরও জানিয়েছে, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে উঠলেও ২০২৭ সালে কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।










