শিশুর জন্য নিরাপদ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা শুধু পরিবারের নয়, রাষ্ট্র ও সমাজেরও দায়িত্ব। প্রতিটি শিশু যেন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ পায়, নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে এবং নিজের মতামত প্রকাশের অধিকার ভোগ করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো দেশের অসংখ্য শিশু দারিদ্র্য, বৈষম্য, নির্যাতন ও নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার।
শিশুর বিকাশের প্রথম ভিত্তি পরিবার। মা বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের আচরণ শিশুর চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, তার ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দেওয়া এবং ভালোবাসা ও যত্নের মধ্য দিয়ে তাকে বড় করে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য বই পড়া, সুস্থ বিনোদন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ নগরায়ণের চাপে দিন দিন কমছে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পর্যাপ্ত খেলার পরিবেশ নেই। প্রতিটি পাড়া, মহল্লা ও বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারও শিশুদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহারে যুক্তিসংগত সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি বই পড়া, প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, পশুপাখির প্রতি সদয় আচরণ এবং পরিবেশ রক্ষার মতো অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করানো জরুরি।
শিক্ষাব্যবস্থায় বইয়ের চাপ কমিয়ে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে ধারাবাহিকতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে, যাতে শিশুরা বিভ্রান্তির শিকার না হয়। বিজ্ঞানচর্চা, গণিত, সৃজনশীলতা ও অনুসন্ধিৎসাকে উৎসাহিত করে তাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।
শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন ও সহিংসতা রোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিবেশী এবং রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিশুদের উপযোগী ভাষায় নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন করা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি এবং অপরাধের দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিচর্যা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষর করে। এরপরও সুবিধাবঞ্চিত, শ্রমজীবী, পথশিশু এবং দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী বহু শিশুর জীবনমান উন্নয়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। শিশুদের অধিকার রক্ষায় আইন ও নীতিমালার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন জোরদার করতে হবে। শিশুদের প্রয়োজন ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে শিশু বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো এবং সরকারি বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আনন্দ ও বিকাশ নিশ্চিত করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা। সভা সেমিনার ও নীতিগত ঘোষণার বাইরে গিয়ে শিশুদের অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিটি শিশুর জন্য বৈষম্যহীন, নির্যাতনমুক্ত ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।










