বাংলা শিশুসাহিত্যে ছড়ার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছড়ার সহজ ভাষা, ছন্দ, শব্দের মাধুর্য ও কল্পনাশক্তি শিশুদের মনে আনন্দ সৃষ্টি করার পাশাপাশি তাদের মানসিক বিকাশেও ভূমিকা রাখে। বুদ্ধি ও বিচারের চেয়ে শিশুর কাছে রস, আনন্দ ও কল্পনার মূল্য বেশি। তাই শিশুতোষ ছড়ার মূল শক্তি তার স্বাভাবিকতা ও অকৃত্রিমতায়।
বাংলার লোকজ ও শিশুতোষ ছড়ার ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। দাদি-নানির মুখে মুখে, গ্রামীণ জীবনের নানা অভিজ্ঞতায় এবং পারিবারিক পরিবেশে এসব ছড়া প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শিশুতোষ ছড়াকে শিশুর জন্য মায়ের দুধের মতো আদরণীয় ও পুষ্টিদায়ক বলে উল্লেখ করেছেন।
শিশুতোষ ছড়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বতঃস্ফূর্ততা। শিশুর মতো ছড়ার মধ্যেও কৃত্রিমতা থাকা উচিত নয়। প্রকৃতির মতো সহজ ও প্রাণবন্ত ছড়াই শিশুর মনে সহজে জায়গা করে নেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আহসান হাবীব, আবু হাসান শাহরিয়ার, ফারুক নওয়াজ, রতনতনু ঘাটী ও মুস্তাফা মাসুদের মতো কবিদের ছড়ায় এই বৈশিষ্ট্যের নানা দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
ছড়ায় কখনো উঠে আসে চাঁদ, পাখি, নদী, নৌকা, গ্রামীণ জীবন কিংবা শিশুর কল্পনার নানা চরিত্র। এসব বিষয় শিশুর কৌতূহলকে বাড়িয়ে দেয় এবং তার কল্পনার জগৎকে সমৃদ্ধ করে। ছড়ার ছন্দ ও শব্দের খেলায় শিশু যেমন আনন্দ পায়, তেমনি ভাষার সঙ্গে তার পরিচয়ও গভীর হয়।
শিশুর মানস গঠনে ছড়ার ভূমিকা তাই অপরিসীম। ছোটবেলায় শোনা বা পড়া অনেক ছড়া দীর্ঘদিন মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়। মায়ের মুখে শোনা ছড়া কিংবা বইয়ের পাতায় পড়া ছন্দময় পঙ্ক্তি শিশুর শৈশবের সঙ্গে মিশে যায়।
বাংলা শিশুতোষ ছড়া আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির নিজস্ব ঐতিহ্যের অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ধারার বিকাশ ঘটেছে। ভবিষ্যতেও শিশুর আনন্দ, কৌতূহল ও কল্পনাকে কেন্দ্র করে এই ছড়ার ধারা এগিয়ে যাবে—এটাই বাংলা শিশুসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।










