বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইন ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থাকলেও অভিযোগ দায়ের থেকে শুরু করে তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও রায় পর্যন্ত নানা বাধার মুখে পড়ছেন ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবার। পারিবারিক চাপ, আর্থিক সংকট, অভিযুক্তের হুমকি, প্রমাণ নষ্ট হওয়া এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই মামলা শেষ পর্যন্ত এগোয় না। দ্য ডেইলি স্টারের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শিশু নির্যাতনের বিচারপ্রক্রিয়ার এসব সীমাবদ্ধতা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি পরিবারের সদস্য বা পরিচিত হওয়ায় ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা চালিয়ে যেতে দ্বিধায় পড়ে। কোনো কোনো পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা সামাজিক সম্মানহানির আশঙ্কায় মামলা প্রত্যাহারের চেষ্টা করে। আবার প্রভাবশালী অভিযুক্তের পক্ষ থেকে চাপ ও হুমকির কারণেও বিচার চাওয়ার পথ কঠিন হয়ে ওঠে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার জানান, একটি ঘটনায় ছয় বছর বয়সী শিশুর বাবা ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার মা মামলা প্রত্যাহারের সহায়তা চান। পরিবারের আর্থিক সংকট ও দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল এর অন্যতম কারণ। তবে এ ধরনের মামলা আপসের মাধ্যমে প্রত্যাহারের সুযোগ নেই বলে তাকে জানানো হয়।
শিশু অধিকার সংস্থা ‘শিশুরাই সব’-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে শিশু ধর্ষণ নিয়ে প্রকাশিত ৩০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, অভিযুক্তদের মধ্যে ৪০ দশমিক ৫৮ শতাংশ নিকট প্রতিবেশী, ২১ দশমিক ৪৩ শতাংশ পরিচিত ব্যক্তি এবং ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ নিকটাত্মীয় ছিলেন। অর্থাৎ, শিশুদের জন্য পরিচিত পরিবেশও অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিমুক্ত নয়।
জরুরি সেবা ও সহায়তা ব্যবস্থায়ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত ১৭৬টি কল এসেছে। একই সময়ে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৪টি ওসিসিতে শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৮০ শিশু-কিশোরীর ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
তবে সহায়তা কেন্দ্রে পৌঁছালেই সব ক্ষেত্রে মামলা হয় না। হুমকি, পারিবারিক চাপ, সাক্ষীর অভাব ও জোরপূর্বক আপসের কারণে অনেক ঘটনা আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে না। আবার দেরিতে অভিযোগ জানানো, শিশুকে গোসল করানো কিংবা পোশাক ধুয়ে ফেলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রমাণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যালোচিত মামলাগুলোতে তদন্তে গড়ে ১৫২ দিন এবং নিষ্পত্তিতে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৩৭০ দিন সময় লেগেছে। এসব মামলায় দণ্ডাদেশের হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কঠোর শাস্তির বিধান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ তদন্ত, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষীর নিরাপত্তা, শিশু-বান্ধব আদালত এবং ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আইনি ও মানসিক সহায়তা। অভিযুক্ত ব্যক্তি পরিবারের সদস্য হলেও শিশুর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।










