এমআরটি লাইন-১ ও ৫-এর খরচ বাড়ছে দ্বিগুণেরও বেশি
বিমানবন্দর-নতুন বাজার ও হেমায়েতপুর-ভাটারা রুট
ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পে বড় ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, করের হার বৃদ্ধি এবং নকশায় পরিবর্তনের কারণে বিমানবন্দর-নতুন বাজার ও হেমায়েতপুর-ভাটারা রুটের এমআরটি লাইন-১ ও ৫-এর নির্মাণ ব্যয় প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
সরকারের সাত সদস্যের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে কমিটির হিসাবের চেয়েও বেশি ব্যয় ধরে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) ইতোমধ্যে সংশোধিত প্রস্তাব তৈরি করেছে।
৫২ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি
স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। বর্তমানে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।
অন্যদিকে, এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞ কমিটির হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে ৮৮ হাজার থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।
কমিটির প্রধান শামীম জেড বসুনিয়া জানান, পাঁচ থেকে সাত বছর আগে প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির সময়ের তুলনায় নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির হার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে এবং করের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডিএমটিসিএলের হিসাবে ব্যয় আরও বেশি
স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির হিসাবের তুলনায় ডিএমটিসিএলের সংশোধিত প্রস্তাবে দুই প্রকল্পের ব্যয় আরও বেশি ধরা হয়েছে।
সংশোধিত প্রস্তাবে এমআরটি লাইন-১-এর মোট ব্যয় ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে জাপানের অর্থায়ন থাকবে ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। মূল প্রকল্পে মোট ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা এবং জাপানের ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকালও বাড়ানো হচ্ছে। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী সেপ্টেম্বর ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ছিল। সংশোধিত প্রস্তাবে সময় বাড়িয়ে ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, এমআরটি লাইন-৫-এর সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানি অর্থায়নের পরিমাণ ৬৮ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। মূল প্রস্তাবে প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা এবং জাপানের ঋণ ছিল ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা।
লাইন-৫-এর মূল বাস্তবায়নকাল ছিল জুলাই ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত। সংশোধিত প্রস্তাবে তা বাড়িয়ে ২০৩৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কেন এত বাড়ছে ব্যয়?
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি
- মূল্যস্ফীতি
- মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন
- করের হার বৃদ্ধি
- প্রকল্পের নকশায় পরিবর্তন
- কয়েকটি স্টেশনের নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন
- আমদানিনির্ভর নির্মাণসামগ্রীর উচ্চ ব্যয়
বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান শামীম জেড বসুনিয়া বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয়ের সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ ভারতের অনেক নির্মাণসামগ্রী দেশীয়ভাবে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ডিজেল, লোহা, সিমেন্ট ও পাথরের মতো বিভিন্ন উপকরণের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। ফলে এসব পণ্যের মূল্য, পরিবহন ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নির্ভরতার কারণে প্রকল্প ব্যয় বেশি হয়।
জাপানের সঙ্গে চলছে আলোচনা
মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫-এর বিভিন্ন প্যাকেজের দরপত্র জমা দেওয়ার পর ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প দুটির বাস্তবায়ন কার্যত থমকে যায়।
ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে এর আগে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জাপান সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদও ব্যয় কমানোর বিষয়ে আলোচনার জন্য জাপান সফর করেছিলেন।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রকল্প দুটির কাজ পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে যতটা সম্ভব ব্যয় কমিয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কম সুদের ঋণ হারানোর আশঙ্কা
স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান শামীম জেড বসুনিয়া দ্রুত প্রকল্প দুটির কাজ শুরু করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, ঢাকার ক্রমবর্ধমান যানজট ও পরিবহন সমস্যা মোকাবিলায় মেট্রোরেল প্রকল্প দুটি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, জাপান বর্তমানে প্রকল্প দুটির জন্য শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ সুদের হার প্রস্তাব করেছে। গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে সুদের হার বাড়লেও জাপান এই দুই প্রকল্পের ক্ষেত্রে সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে।
তার মতে, প্রকল্প বাতিল করে অন্য কোনো উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে নতুন করে শুরু করলে এত কম সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ নাও থাকতে পারে। তাই ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রেখে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
ইতিমধ্যে ব্যয় ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি
ব্যয় বাড়লেও দুই প্রকল্পে ইতিমধ্যে বিপুল অর্থ খরচ হয়ে গেছে। গত বছরের জুন পর্যন্ত এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে ৩ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পে ৫ হাজার ১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
অর্থাৎ, দুই মেট্রোরেল প্রকল্পে ইতিমধ্যে মোট ৮ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
এখন সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষে প্রকল্প দুটির ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য প্রকল্প দুটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ব্যয়ের লাগাম টেনে অর্থনৈতিকভাবে টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার










