ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘নাজা’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলি দুই নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোর নির্মিত সিনেমাটি সম্প্রতি ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার অর্জন করেছে। পুরস্কার পাওয়ার পর থেকেই সিনেমাটি নিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও সিনেমাটির সমালোচনা করেছেন। সোমবার টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষী উসকানি ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে। তার দাবি, দুই ইসরায়েলি পরিচালক দেশটির সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং এর জন্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা পেয়েছেন।
প্রায় ৮০ মিনিটের তথ্যচিত্র ‘নাজা’তে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কীভাবে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ করে, সেই প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে সামরিক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সম্ভাব্য বেসামরিক প্রাণহানিকে কীভাবে বিবেচনা করা হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
নির্মাতারা জানিয়েছেন, সিনেমাটি তৈরির জন্য তারা প্রায় তিন বছর ধরে ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের ২৪ জন কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সাক্ষাৎকারদাতাদের পরিচয় গোপন রাখতে রাতে তেল আবিবের বিভিন্ন ছাদে এসব সাক্ষাৎকার ধারণ করা হয়। পরে প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের মুখ ও কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারদাতাদের কয়েকজন দাবি করেছেন, গাজার এমন এলাকাতেও হামলা চালানো হয়েছে যেখানে বেসামরিক মানুষের উপস্থিতি সম্পর্কে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আগে থেকেই অবগত ছিল। সিনেমায় এমন একটি হামলার কথাও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে একজন হামাস সদস্যকে লক্ষ্য করে হামলার অনুমোদন দেওয়া হলেও সম্ভাব্য বেসামরিক প্রাণহানির সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
‘নাজা’ নির্মাতাদের বিরুদ্ধে শুধু প্রধানমন্ত্রীই নয়, ইসরায়েল সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার দুই নির্মাতার নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি জানিয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলেছেন। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরও তাদের সমালোচনা করেছেন।
এদিকে সিনেমাটিতে সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান এয়াল জামির তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটি ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। প্রদর্শনীর পর প্রায় সাড়ে ২৪ মিনিট ধরে দর্শকদের দাঁড়িয়ে অভিবাদন পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। দর্শকদের অনেকে এ সময় ফিলিস্তিনি পতাকা প্রদর্শন করেন।
পুরস্কার গ্রহণের সময় ইউভাল আব্রাহাম বলেন, ইসরায়েলের মানুষের জন্য এই সিনেমা দেখা গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, কোনো অপরাধ অস্বীকার করা হলে সেটিই অপরাধকে চলমান রাখতে সহায়তা করে। সিনেমাটি গাজায় কাজ করা ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদেরও স্মরণ করেছে, যারা যুদ্ধের শুরু থেকেই সেখানকার পরিস্থিতি নথিবদ্ধ করছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।










